Valentaince-Day

বাংলারশিক্ষা ন্যাশনাল ডেক্স:
ভা-লো-বা-সা চার বর্ণের এক আশ্চর্য মায়াময় শব্দ। অতি প্রাকৃতিক উপলব্ধি এই ভালোবাসা। ভালোবাসা হচ্ছে একপ্রকার সঞ্জিবনী সুধা। যা পান করে প্রতিটি নর-নারী তাদের জীবনকে বিচিত্রভাবে অভিসিক্ত করে। সেই সাথে জীবনকে করে তোলে প্রফুল্ল। পৃথিবীতে সবচেয়ে প্রাচীনতম, সবচেয়ে রোমাঞ্চকর, স্বপ্নীল এবং তাক লাগানো বিষয় হলো ভালোবাসা।

পৃথিবীর কোথাও খুঁজে এমন একজন নর-নারীকে পাওয়া যাবেনা, যে জীবনে একবার হলেও প্রেমে পড়েনি বা ভালোবাসেনি। ভালোবাসা পৃথিবীর একমাত্র মৌলিক বিষয়, যার মৌলিকত্ব ধনী-গরিব, ছোট-বড়, ধর্ম-বর্ণ-গোত্র নির্বিশেষে সকলকে স্পর্শ করে। ভালোবাসার নির্দিষ্ট কোন সংজ্ঞা হয় না। আসলে ভালোবাসা হলো সম্পূর্ণটাই অনুভূতির ব্যাপার। মনের এক অদৃশ্য কোনায় এর বসবাস। নির্দিষ্ট কিছু কথা, কোন ছক, ব্যাখ্যা বা ব্যাকরণ দিয়ে এর পরিপূর্ণ প্রকাশ ঘটানো সম্ভব নয়। ভালোবাসার ক্ষেত্রে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো সুন্দর মন। মনটা সুন্দর হলেই কাউকে ভালোবাসা যায়। ভালোবাসলে ভালোবাসার মানুষ ছাড়া পৃথিবীকে রূপহীন, রসহীন ধূ- ধূ মরুভূমি মনে হয়। এ সময় প্রতিটি সকাল আসে নিত্য নতুন প্রত্যাশা নিয়ে। কর্মহীন সময়ে এমনকি কর্মব্যস্ততার মাঝেও ভাবতে ভালো লাগে প্রিয়জনের কথা। রাতে হঠাৎ ঘুম ভেঙে গেলেও মনে পড়ে প্রিয়জনের কথা।

ভালোবাসা এক রহস্য-আশ্চর্য বিষ্ময়। আনন্দ-বেদনা বিজরিত এক মিশ্র অনুভূতি এই ভালোবাসা। মোট কথা সকল চিন্তা চেতনায়, আলোচনায়-সমালোচনায়, স্বপনে জাগরণে, থাকে শুধু ভালোবাসার মানুষের আনাগোনা। দুনিয়াটাই বিশাল এক প্রেমের ক্ষেত্র। এখানে সবাই প্রেমের অদৃশ্য ফাঁদে আটকা পড়ে। প্রকৃতপক্ষে প্রেমের রাজ্যে আমরা সবাই একাকার। নিজ নিজ মনের ভূবনে আমরা সবাই প্রেমিক। কেউ জেনে, কেউ না জেনে, কেউ ভেবে, কেউ না ভেবে আমরা সবাই প্রেমে পড়ি, ভালোবাসি।

সেন্ট ভ্যালেন্টাইনস ডে’ অর্থাৎ ভালোবাসা দিবসের ইতিহাস খুঁজতে গিয়ে অনেক ধরণের কাহিনী জানা যায়। প্রধান যে কাহিনীটা প্রচলিত আছে, তা হলো- রোমান একজন কৃশ্চিয়ান পাদরি সেন্ট ভ্যালেন্টাইন এর নাম অনুসারে। তিনি ছিলেন একজন পাদরি এবং একই সাথে একজন চিকিৎসক। কিন্তু সেই সময় রোমানদের দেবদেবীর পূজার বিষয়টি মুখ্য ছিল। তারা কৃশ্চিয়ান ধর্মে বিশ্বাসী ছিল না। কৃশ্চিয়ান ধর্ম প্রচারের অভিযোগে ২৭০ খ্রিষ্টাব্দে রোমের দ্বিতীয় সম্রাট ক্লডিয়াস এর আদেশে ভ্যালেন্টাইনের মৃত্যুদ-ের আদেশ দেয়া হয়েছিল। তিনি যখন জেলখানায বন্দী ছিলেন, তখন ছোট ছোট ছেলেমেয়েরা তাকে ভালোবাসার কথা জানিয়ে জেলের জানালা দিয়ে চিঠি ছুঁড়ে দিত। বন্দী অবস্থাতেই জেইলারের অন্ধ মেয়ের চিকিৎসা করে দৃষ্টি শক্তি ফিরিয়ে দেন সেন্ট ভ্যালেন্টাইন। মেয়েটির সাথে তার যোগাযোগ ঘটে চিঠিতে। মৃত্যুর আগে মেয়েটিকে লেখা এক চিঠিতে তিনি জানান তার ভালোবাসার কথা। চিঠির শেষে লেখা ছিল ফ্রম ইউর ভ্যালেন্টাইন।

অনেকের মতে, সেন্ট ভ্যালেন্টাইনের নাম অনুসারেই পোপ প্রথম জুলিয়াস ৪৯৬ খ্রিষ্টাব্দে ১৪ ফেব্রুয়ারিকে “সেন্ট ভ্যালেন্টাইনস ডে” হিসেবে ঘোষণা করেন।

আরও একজন ভ্যালেন্টাইন এর নাম পাওয়া যায় ইতিহাসে। রোমান সম্রাট ক্লডিয়াস যুদ্ধের জন্য ভালো সৈন্য সংগ্রহের উদ্দেশ্যে ওই রাজ্যের যুবকদের বিয়ে করতে নিষেধ করেন। কিন্তু এই ভ্যালেন্টাইন নিয়ম ভেঙে প্রেম করেন, তারপর বিয়ে করেন। ফলে তার মৃত্যুদণ্ড হয়।

আদিকালে রোমানরা মনে করত ১৪ ফেব্রুয়ারিকে পাখিরা তাদের জীবন সঙ্গী খুঁজে নিত। তাই, তারা এই দিনটিকে ভালোবাসা দিবসের জন্য উপযুক্ত মনে করত।

এই সকল বিভিন্ন ঘটনাকে সামনে রেখেই বিশ্বজুড়ে ১৪ ফেব্রুয়ারিকে “ভ্যালেন্টাইন্স ডে” পালিত হয়। এজন্য বিশ্ব জুড়ে ব্যবহ্যত হয় অসংখ্য ডিজাইনের কার্ড, ফুলসহ আরও অন্যান্য উপহার সামগ্রী। দিন দিন এর ব্যাপ্তি বেড়েই চলেছে।

আমাদের বাংলাদেশে এই দিনটার অবস্থান কিছুটা ভিন্ন। এখানে ভ্যালেন্টাইনস্ ডে পালিত হয় ব্যাপকভাবে ভালোবাসা দিবস হিসেবে। এখানে একটি বিষয গুরুত্বপূর্ণ সেটি হলো বিশ্ব জুড়ে শুধু প্রেমিক প্রেমিকারা কিংবা স্বামী – স্ত্রীরা ভালোবাসা দিবস পালন করে। কিন্তু বাংলাদেশে ভালোবাসা দিবস কেবল প্রেমিক প্রেমিকাতে সীমাবদ্ধ না থেকে, তা ছড়িয়ে পড়েছে বাবা-মা, ভাই-বোন, সন্তান, বন্ধু-বান্ধব,আত্মীয়-অনাত্মীয়, প্রিয় ব্যক্তিত্ব সকলের প্রতি। ভালোবাসা প্রকাশের মাধ্যমে এই দিনটি আমাদের দেশে ব্যাপকভাবে পালিত হয়।

তবুও আমাদের অস্থির সমাজে সুস্থ সুন্দর ভালোবাসা হারিয়ে যাচ্ছে দিনের পর দিন। স্যাটেলাইট সংস্কৃতি আমাদের অনেকেরই মননশীলতা আর চিন্তা চেতনাকে নষ্ট করছে দিনের পর দিন। অর্থের কাছে দিন দিন ভালোবাসা জিম্মি হয়ে পড়ছে। ভালোবাসা কোন পণ্য নয়, ভালোবাসা মানে জীবন। এই জীবনকে রক্ষার জন্য আত্মশুদ্ধি ও আত্মচর্চার প্রয়োজন। শুধু বাহ্যিক সৌন্দর্য নয়, মনের সৌন্দর্য যাচাই করে ভালোবাসতে হয়। একমাত্র সকলের প্রতি আমাদের নিঃস্বার্থ ভালোবাসাই পারে অশান্ত পৃথিবীটাকে শান্ত ও বাসযোগ্য করতে।