Government-JOb

বাংলারশিক্ষা ন্যাশনাল ডেক্স:
জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের বিভিন্ন দপ্তর, অধিদপ্তর, সংস্থা এবং অন্যান্য মন্ত্রণালয় সংশ্লিষ্ট হাজার হাজার মামলা আপিল বিভাগ, হাইকোর্ট ও প্রশাসনিক ট্রাইব্যুনালে বিচারাধীন রয়েছে। ওসব মামলার কারণে সরকারি চাকরিতেও দীর্ঘদিন ধরে শূন্য অবস্থায় রয়েছে হাজার পদ। বর্তমানে ওই ধরনের ৫ হাজার ৩৭৪টি মামলা রয়েছে। ওসব মামলা যথাযথ পরিচালনা বা সময়মতো পদক্ষেপ না নেয়ায় বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই সরকারের বিপক্ষে রায় গেছে। জনপ্রশাসন সংশ্লিষ্টরা মনে করেন, ওসব মামলার ক্ষেত্রে সময়মতো যথাযথ নজর দিলে এমন পরিস্থিতির সৃষ্টি হতো না। বর্তমানে বিপুল মামলার স্তূপের কারণে রাষ্ট্রের আইনজীবী, আইন শাখার কর্মকর্তারা থাকার পরও এখন বেসরকারি আইনজীবী নিয়োগ দিতে হচ্ছে। উচ্চ আদালত থেকে আসা ওসব মামলার বিবাদী সচিবসহ বিভিন্ন সংস্থা ও অধিদপ্তরের প্রধানরা। জনপ্রশাসন এবং আদালত সংশ্লিষ্ট সূত্রে এসব তথ্য জানা যায়।

সংশ্লিষ্ট সূত্র মতে, জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়কে মূলত সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের নিয়োগ, পদোন্নতি, প্রশিক্ষণ, চাকরি স্থায়ী ও একীভূতকরণ, পেনশনসহ বিভিন্ন কাজ করতে হয়। ওসব কাজে বেশিরভাগ কর্মকর্তা-কর্মচারীর বঞ্চনার অভিযোগ রয়েছে। ফলে অনেকেই তাদের ন্যায্য দাবি আদায়ে মন্ত্রণালয়ের বিরুদ্ধে মামলা করেন। তার মধ্যে রয়েছে বেতন স্কেল বাড়ানো, পদোন্নতি, প্রকল্পভুক্ত ও দৈনিক ভিত্তিতে কর্মরতদের চাকরি স্থায়ীকরণসহ বিভিন্ন বিষয়। তাছাড়া বিভাগীয় পর্যায়েও অনেক মামলা রয়েছে। ওসব মামলার কারণে প্রশাসনের শূন্য পদে জনবল নিয়োগ কার্যক্রমও ব্যাহত হচ্ছে।

সূত্র জানায়, দীর্ঘদিন ধরে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের বিভিন্ন দপ্তর, অধিদপ্তর, সংস্থার পাঁচ সহস্রাধিক মামলা নিয়ে জোরালো কোনো তৎপরতা নেই। আর ওসব মামলার কারণে সরকারি চাকরিতে হাজার হাজার পদ শূন্য রয়েছে। এমনকি প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নির্দেশের পরও ওই শূন্য পদ পূরণ হচ্ছে না। বিগত গত ১৭ জানুয়ারি প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয় পরিদর্শনে এসে উচ্চ আদালতে দায়েরকৃত মামলা পরিচালনার ক্ষেত্রে আরো তৎপর হওয়ার নির্দেশ দেন। তাছাড়া সরকারের পক্ষ থেকে মামলা আরো দক্ষতার সঙ্গে পরিচালনা করার জন্য তিনি স্থায়ী অ্যাটর্নি সার্ভিস গঠনেরও নির্দেশনা দিয়েছেন। তারপর গত ৮ মে অ্যাটর্নি সার্ভিস গঠনের জন্য আইন ও বিচার বিভাগের সচিব বরাবর চিঠি পাঠায় জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়। কিন্তু চিঠি পাঠানোর প্রায় সাত মাস পরও কোনো অগ্রগতি না হওয়ায় আইন সচিবকে একাধিকবার তাগাদাপত্র দিয়ে এবং প্রধানমন্ত্রীর মুখ্য সচিব বরাবর অনুলিপি পাঠানো হয়েছে। বিদ্যমান পরিস্থিতিতে প্রশাসনিক কার্যক্রম অনেকটা স্থবির হয়ে পড়েছে। পাশাপাশি সরকারি সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নেও গতি কমেছে।

সূত্র আরো জানায়, জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের আইন শাখা বছরের পর বছর ধরে মামলা নিয়ে তেমন কোনো কাজই করেনি। ফলে এখন রাষ্ট্রীয় টাকা বাড়তি খরচ করে বেসরকারি আইনজীবী নিয়োগ দিতে হচ্ছে। কিন্তু দেখা যাবে নিয়োগের পর আর কেউ কাজ করতে চাইছেন না। অথচ জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের আইন শাখার নিজেদেরই ওসব কাজ করা উচিত। বিদ্যমান পরিস্থিতির কারণে স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন উঠেছে- কেন আইন শাখার কর্মকর্তারা বছরের পর বছর এসব মামলা নিষ্পত্তি করেননি? তবে আইন শাখার কর্মকর্তাদের দাবি- আইনজীবী নিয়োগ না করলে এতো মামলার জবাব কোনোভাবেই তাদের পক্ষে দেওয়া সম্ভব নয়। পাশাপাশি জনপ্রশাসনের মামলা নিষ্পত্তির জন্য বাজেট বরাদ্দ ও আইন অনুবিভাগে জনবল বাড়াতে হবে। তাছাড়া প্যানেল আইনজীবী ও স্থায়ী অ্যাটর্নি সার্ভিস গঠন করা অপরিহার্য হয়ে পড়েছে। বর্তমানে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের আইন শাখার প্রায় সবাই বদলি হয়ে গেছেন। আইন শাখায় স্থায়ী কোনো জনবল নেই। তাছাড়া যে কয়েকজন কর্মকর্তা কর্মরত, তাও চাহিদার তুলনায় অনেক কম।

এদিকে সরকার বিগত ২০০২ সালে স্থায়ী অ্যাটর্নি সার্ভিস প্রতিষ্ঠার উদ্যোগ নিয়েছিল। আইন মন্ত্রণালয় ওই সংক্রান্ত আইনের একটি খসড়াও তৈরি করেছিল। কিন্তু তা আর চূড়ান্ত হয়নি। ফলে আদালতে রাষ্ট্রপক্ষে মামলা পরিচালনা করেন সরকারি আইনজীবীরা। বাংলাদেশ ল অফিসার্স অর্ডার-১৯৭২ অনুযায়ী ওই আইনজীবীদের চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ দেয়া হয়। আর তাদের দক্ষতা বিবেচনার বদলে সাধারণত রাজনৈতিক বিবেচনায় নিয়োগ হয়ে থাকে। মূলত সরকারি আইনজীবীদের অদক্ষতার কারণে বেশিরভাগ মামলায় সরকার পরাজিত হয়। তাছাড়া সরকার বদল হলে নিয়োগের চুক্তি বাতিল হওয়ায় পুরোনো মামলা পরিচালনার জন্যও নতুন নিয়োগ পাওয়া আইনজীবীরা আগ্রহ দেখান না। ফলে পুরোনো মামলাগুলো চলে যায় হিমাগারে। সরকারের বিভিন্ন মন্ত্রণালয় ও বিভাগের আইন অনুবিভাগে স্থায়ী কোনো জনবল নেই। ফলে বেশিরভাগ কর্মকর্তা স্বল্প সময়ের জন্য এসে দায়সারাভাবে কাজ করেন। এভাবে একদিকে মামলাজট বাড়ে, অন্যদিকে ন্যায়বিচার থেকে বঞ্চিত হয় বিচারপ্রার্থীরা।

অন্যদিকে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের মামলা প্রসঙ্গে উচ্চ আদালতের অভিজ্ঞ আইনজীবীদের মতে, প্রতিবেশী রাষ্ট্রগুলোর মধ্যে একমাত্র বাংলাদেশ বাদে সব রাষ্ট্রে আইন ক্যাডার কর্মকর্তা রয়েছে। আর সরকারের আইন ক্যাডার না থাকায় প্রতিনিয়ত অনেক আইন লঙ্ঘিত হচ্ছে। ফলে সরকারের বিরুদ্ধে অগণিত মামলা হচ্ছে। এদেশে অস্থায়ী ভিত্তিতে রাজনৈতিক বিবেচনায় আইন কর্মকর্তা নিয়োগ হয়। ওই কারণে সরকার বেশিরভাগ মামলায় হেরে যায়। সার্বিকভাবে রাষ্ট্র ও বিচারপ্রার্থী জনগণ ক্ষতিগ্রস্ত হয়। আইন কর্মকর্তা ছাড়া আইনের শাসন সম্ভব নয়।

এ বিষয়ে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের আইন অনুবিভাগের অতিরিক্ত সচিব মুহাম্মদ আল-আমীন জানান, জনপ্রশাসনের গুরুত্বপূর্ণ মামলাগুলো অধিকতর তৎপরতার সঙ্গে পরিচালনার জন্য বেসরকারি আইনজীবী নিয়োগ করা হয়েছে। আর স্থায়ী অ্যাটর্নি সার্ভিস গঠনের জন্য আইন ও বিচার বিভাগের সচিব বরাবর একাধিকবার চিঠি পাঠানো হয়েছে। জনপ্রশাসনে মামলাগুলো দ্রুত নিষ্পত্তির জন্য প্রধানমন্ত্রীও নির্দেশ দিয়েছেন।

একই প্রসঙ্গে আইন ও বিচার বিভাগের সচিব মো. গোলাম সারওয়ার জানান, সরকারি কৌঁসুলিদের মামলা পরিচালনার সুবিধার্থে অ্যাটর্নি সার্ভিস গঠনের বিষয়টি সরকারের সক্রিয় বিবেচনায় রয়েছে। তবে বিভিন্ন মন্ত্রণালয় ও বিভাগের মামলাগুলো দ্রুত নিষ্পত্তির জন্য অ্যাটর্নি জেনারেলের অফিস সহায়তা করছে। সেজন্য আলাদা আইনজীবী শাখা আছে। তারাও কাজ করছেন।
সৌজন্যে: দৈনিক মাদারীপুর সংবাদ