Dr-Tapon-Bagchi_11.01.2020
বাংলা একাডেমির উপ-পরিচালক ড. তপন বাগচী’র সাক্ষাতকার নিচ্ছেন বাংলারশিক্ষা’র প্রকাশক মোহাম্মদ রাহাত হোসেন। ছবি: বাংলারশিক্ষা

মাদারীপুরের সন্তান ড. তপন বাগচী। যিনি বর্তমানে দায়িত্ব পালন করছেন বাংলা একাডেমির উপ-পরিচালক হিসেবে। মাদারীপুরের বই মেলা ও সাহিত্যে উৎসবে এসেছিলেন অতিথি হিসেবে। এবছর অর্জন করেছেন সুনীল সাহিত্য পুরস্কার। বাংলারশিক্ষা’র নতুন শহর, মাদারীপুর কার্যালয় বই মেলা উদ্বোধনের পর (১১ জানুয়ারি’২০২০) সাক্ষাতকার গ্রহণ করছেন বাংলারশিক্ষা’র প্রকাশক মোহাম্মদ রাহাত হোসেন। পাঠকদের জন্য সাক্ষাতকারটি তুলে ধরা হলো।

বাংলারশিক্ষা: কেমন আছেন?
ড. তপন বাগচী: ভালো আছি। নিজের জায়গা মাদারীপুরে এলাম। নিজের জায়গায় শেকড়ের খোঁজে আসলে তো ভালো লাগেই। নিজ

বাংলারশিক্ষা: জেলায় এসে স্থানীয়ভাবে আয়োজিত বই মেলা উদ্বোধন করলেন, আপনার অনুভূতিটা কেমন?
ড. তপন বাগচী: আমার অনুভূতিটা একটু মিশ্র। আমি বাংলাদেশের প্রায় ৬০টি জেলায় এরকম অনুষ্ঠানে যোগ দিয়েছি। কিন্তু নিজের জেলায় আসার সুযোগ ঘটেনি। সেই কারণে একটু মন খারাপ থাকত, কিন্তু আজ সেই আক্ষেপটি পূরণ হয়ে গেলো। যাদের জন্য কাজ করি, যে মাটি থেকে বেড়ে উঠেছি তারা আমাকে নিজের ভেবেই ডেকেছে। এটাই আমার জন্য অত্যন্ত আনন্দের।

বাংলারশিক্ষা: জেলা শহরের এই বই মেলা সম্পর্কে আপনার মতামত জানতে চাই।
ড. তপন বাগচী: আমি অনেক জেলায় গিয়েছি। এই আঞ্চলিক বই মেলা এর চেয়ে বড় পরিসরে খুব বেশি হয় না। কেননা এখানে জাতীয় পর্যায়ের লেখক বা জাতীয় পর্যায়ের প্রকাশক বা তাদের এতো বই বহন বা নানা কারণে আসা হয়ে উঠে না। সেখানে এই মেলায় এ অঞ্চলের যত লেখক তাদের বই মেলার স্টলগুলোতে রাখা হয়েছে এটা বড় ঘটনা। পাশাপাশি ঢাকা থেকে বেশ কয়েকটি প্রকাশক ঐতিহ্য, কবি প্রকাশনী, বেহুলা বাংলাসহ আরো বেশ কিছু প্রকাশনী তাদের বই পাঠিয়েছে। এই মেলায় যেটা হয় বিক্রি কতটা হবে না হবে সেটি পরের কথা, বড় কথা এই বইগুলোর সাথে পরিচিত হয়। মাদারীপুরের যারা লেখালেখি করে তারা এই বই মেলাকে কেন্দ্র করে বাড়িতে আসে এবং মেলায় যোগদান করে। এর ফলে পারস্পরিক মেলবন্ধন ঘটে এটি বড় কথা। এখানে আমরা যারা ঢাকায় থাকি, ঢাকায় লিখি বা জাতীয় পত্র-পত্রিকায় লিখি, আমাদের যাদের বই বেরিয়েছে, বয়সের কারণেই হোক এগিয়ে আছি তাদের সাথে নতুন যারা লিখছে তাদের সাথে সংযোগ তৈরি হওয়া। আজকে এখানে চারটি বইয়ের মোড়ক উন্মোচন হয়েছে, যারা এই মাদারীপুরেই সন্তান, মাদারীপুরেই লেখক, তারা এখানে বসেই বই লিখছেন, এটা আনন্দের কথা। মেলা উপলক্ষে তারা যেমন আমাকে পেলো, আমিও তাদের পেলাম, তাদের বই পেলাম। এভাবে যদি পারস্পরিক যোগাযোগটা বৃদ্ধি পায় সেখানে ব্যাপক অর্থে মাদারীপুরের যেমন মঙ্গল এবং মাদারীপুরে বসে লিখেও যেমন আমরা জাতীয় পর্যায়ে যেতে পারি সেরকম একটা আশার সঞ্চার এখানো হলো।

Dr-Tapon-Bagchi_11.01.2020-
সুনীল সাহিত্য পদক হাতে ড. তপন বাগচী

বাংলারশিক্ষা: আঞ্চলিক বই মেলাকে সমৃদ্ধ করতে বাংলা একাডেমি কোন পদক্ষেপ আছে কিনা বা গ্রহণ করবে কিনা?
ড. তপন বাগচী: আঞ্চলিক বই মেলা এটা আসলে বাংলা একাডেমির এখতিয়ার না, এটার জন্য সরকারি আরেকটি প্রতিষ্ঠান আছে। যেটা আমরা অনেকে জানি না। সেটা হচ্ছে জাতীয় গ্রন্থ কেন্দ্র। তারা জেলায় জেলায় বই মেলার আয়োজন করে। আঞ্চলিক পর্যায় বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রিক বই মেলার আয়োজন করে। তাদেরকে ডাকলে তারা যেমন সহযোগিতা করে আবার তারাও নিজেদের উদ্যোগেও বই মেলা করে। এখানে যদি বাংলা একাডেমিকে বলা হতো তাহলে তারা তাদের প্রকাশিত বই নিয়ে আসার সুযোগ পেতো। যত আঞ্চলিক বই মেলা হয় বাংলা একাডেমি কিন্তু সেখানে অংশগ্রহণ করে। কিন্তু সেই উদ্যোগটি এখানে নেওয়া হয়নি, সেই উদ্যোগটা নিয়ে অংশগ্রহণের সুযোগটা পাওয়া যেতো।

বাংলারশিক্ষা: আমরা সাম্প্রতিক সময় দেখি তথ্য-প্রযুক্তির কারণে কিশোর-যুবক-বয়স্ক সকল শ্রেণির মানুষ প্রযুক্তির প্রতি বেশি আসক্ত হচ্ছে এবং বই থেকে সরে যাচ্ছে, এই বিষয়টি আপনার কি মনে হয়?
ড. তপন বাগচী: বইয়ের কনসেপ্টটা যা ছিল বই মানে দুই মলাটের ভিতরে সাদা কাগজে কালো অক্ষর। এটি যখন চলচ্চিত্রে এলো তখনো আমরা এমন হাহাকার শুনেছিলাম, চলচ্চিত্রে যখন বইয়ের ঘটনা রূপ দিচ্ছে হয়তঃ মানুষ আর বই পড়া বন্ধ করে দিবে, সেটা হয় নাই। যখন সংবাদপত্রের ব্যাপক প্রচার হলো প্রতি শুক্রবার যে পরিমান সাহিত্য থাকে, প্রতি শুক্রবার যদি আমরা বড় কাগজের মানসম্পন্ন ২০টি কাগজও ধরি, ২০টি কাগজে ৪ পৃষ্ঠা করে বড় বোর্ডের ৮০ পৃষ্ঠার সাহিত্য তৈরি হয়, তা একজন পাঠক যদি পত্রিকা পড়ে তাতে কিন্তু বই পড়ার দরকার হয় না। তারপরও কিন্তু বইয়ের প্রচার, প্রসার কমেনি। বইয়ের একটি আলাদা ব্যাপার আছে, হাতে নিয়ে পড়া, যখন ইচ্ছা-খুশি তাক থেকে নিয়ে পড়া, অনেক পুরানো জিনিস খুঁজে পড়া, ইচ্ছা করলে লাইব্রেরী থেকে অনেক পুরানো বই খুঁজে নিয়ে পড়া যায়। কিন্তু দৈনিক পত্রিকায় সেটা সম্ভব না। যার কারণে বইয়ের আবেদন কখনো কমবে না।
প্রযুক্তির প্রতি যেই আকর্ষণ সেটি যদি সম্পর্কে আমি যদি বলি, ধরুণ আমারও প্রযুক্তির প্রতি আসক্তি আছে, কিন্তু আমি ইন্টারনেট থেকে, অনেক লাইব্রেরী থেকে অনেক পুরানো বইয়ের পিডিএফ কপি খুঁজে পড়ি। এখন প্রযুক্তির সেই ব্যবহারটা যদি আমি গেইম কিংবা চ্যাটিং এর মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখি তাহলে ক্ষতিকর। কিন্তু আমি ফেসবুকের মধ্যে যদি আমি বইয়ের সন্ধান পাই, ফেসবুকের মধ্যে অনেক সময় অনেক ভালো ভালো লেখা প্রকাশিত হয়, ফেসবুকে অনেক ভালো ভালো বইয়ের লিঙ্ক থাকে, ফেসবুকের মাধ্যমে আমি অনেক বই কিনতে পারি, অনেক প্রকাশনীর খবর পাওয়া যায়। আর এখন তো অনলাইনে অনেক বই বিক্রির প্রতিষ্ঠান রয়েছে, যেমন রকমারী। অর্থাৎ ফেসবুকের প্রযুক্তির প্রতি আসক্তিটা দুষণীয় নয় কিন্তু সেই আসক্তি যদি ইতিবাচক দিকে ধাবিত হয়, শুধুমাত্র যদি হালকা বিনোদন হিসেবে না নিয়ে ভালো দিকটা নিতে পারি তাহলে প্রযুক্তির সুফলটা নিতে পারবো। যে ব্যবহারকারী তার রুচির উপর তার কৌশলের উপর ফলাফল নির্ভর করে।

বাংলারশিক্ষা: বাংলারশিক্ষা’র প্রতি আপনার পরামর্শ ও মতামত?
ড. তপন বাগচী: বাংলারশিক্ষা শুধুমাত্র মাদারীপুর জেলা নিয়ে কাজ করলে অর্থাৎ শুধু আঞ্চলিকভাবে হলেও সেটা এখন আর আঞ্চলিকতা নাই। কারণ আমরা এখন মুহূর্তের মধ্যে যেকোন স্থান থেকে বাংলারশিক্ষা দেখা যায়, মুহূর্তের মধ্যে সব খবর পাওয়া যায়। বাংলারশিক্ষা যদি শুধুমাত্র মাদারীপুর জেলার শিক্ষার সংবাদও প্রকাশ করে তাতেও একটা জার্নাল চলতে পারে। পাশাপাশি জাতীয় পর্যায়ের শিক্ষা বিষয়ক সরকারের যতধরণের সংবাদ, নোটিশ, প্রজ্ঞাপন বা দুর্নীতি থাকে সেগুলো তুলে ধরতে পারি তাহলে সবাই সচেতন হবে। আঞ্চলিক পত্রিকা হিসেবে আমি মনে করি, যা করা প্রয়োজন তা হচ্ছে স্থানীয়ভাবে যে শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলো আছে সেগুলোর এক একটির ইতিহাস, পরিচিতি একেকদিন তুলে ধরে তাহলে তা কিন্তু আমাদের শিক্ষার জাতীয় ইতিহাস নির্মাণে ভূমিকা রাখবে। এছাড়া যারা ত্যাগী শিক্ষক রয়েছেন শিক্ষাকে ব্রত হিসেবে নিয়েছেন তাদের সাক্ষাতকার, জীবন তথ্য যদি তুলে ধরা হয় তাহলে আরো অনেক শিক্ষক তাদের থেকে উপকৃত হবেন।
আমাদের শিক্ষকরা যখন শিক্ষার বাইরে অন্যান্য কাজে যুক্ত হয়, শিক্ষার দিকে মনোযোগী নয়, যেমন আমরা বিশ্ববিদ্যালয়ে কিছু শিক্ষার্থী উদ্যোগ নিয়েছিলাম, আমি যে স্কুল থেকে পাস করেছি যেমন কদমবাড়ি স্কুল ঐ এলাকার স্কুলগুলোকে আমরা শিক্ষকদের মোটিভেট করার উদ্যোগ নিয়েছি শিক্ষকদের কাজ কতটুকু, তাদের ক্লাসরুমের সময়টুকু যথাযথভাবে দেয় তাহলে শিক্ষার মান বাড়বে, রেজাল্ট বাড়বে এরকম মোটিভেট করা। সেই মোটিভেট করার জন্য আমি মনে করি এলাকার যারা প্রবীণ শিক্ষক তাদের দিয়ে লেখানো। হয়তো তারা লিখবে না তাদের কাছে গিয়ে গিয়ে তাদের ইন্টারভিউ নিয়ে যেমন- আপনার অভিজ্ঞতা কী, এখন কেন শিক্ষার মান কমে যাচ্ছে ইত্যাদি বিষয়ে তাদের মতামত যদি সংগ্রহ করে বাংলারশিক্ষা’য় প্রকাশের মাধ্যমে শিক্ষার উন্নয়নে ভূমিকা রাখতে পারে। বর্তমানে স্কুল পরিচিতি, শিক্ষক পরিচিত এবং প্রবীণ শিক্ষকের সাক্ষাতকার এই তিনটি তাৎক্ষণিকভাবে মনে পড়লো তাই এই তিনটি বিষয়ে গুরুত্ব দেয়া জন্য বললাম।

বাংলারশিক্ষা: বাংলারশিক্ষা’কে আপনার মূল্যবান সময় দেয়ার জন্য ধন্যবাদ।
ড. তপন বাগচী: আপনাকে ধন্যবাদ। আপনার মাধ্যমে বাংলারশিক্ষা’র সকল পাঠককেও আমার ধন্যবাদ।