Kalkini Primary School

অজয় কুন্ড, বাংলারশিক্ষা:
নেই দরজা। নেই কোন জানালা। টিনের বেড়ার নানা অংশ ভেঙে পড়েছে। ওপরের টিনের চালে একাধিক স্থানে বড় বড় ছিদ্র। বৃষ্টি হলেই ঝর ঝর করে পড়ে পানি। ভিজে যায় শিক্ষার্থীদের বই খাতা। মাদারীপুরের কালকিনির উপজেলার আলীনগর ইউনিয়নের ১৮২নং পশ্চিম কালিনগর হাওলাদারকান্দি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় দৃশ্য এটা।

উপজেলা শিক্ষা কার্যালয় ও বিদ্যালয়টির সূত্র জানায়, কালিনগর হাওলাদারকান্দি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়টি ১৯৯৫ সালে প্রতিষ্ঠিত হয়। পরে ২০১৩ সালে এটি জাতীয়করণ (সরকারি) করা হয়। বর্তমানে এখানে ১০৫ জন শিক্ষার্থী রয়েছে। বিদ্যালয়ে পাঁচজন শিক্ষক রয়েছেন। এরমধ্যে চারজনই শিক্ষিকা। মূল ভবনটি একাধিক স্থানে ফাটল ও পলেস্তারা খসে পড়ায় ২০০৯ সাল থেকে বিদ্যালয়টি ঝুঁকিপূর্ণ ঘোষণা করেন উপজেলা প্রশাসন। এরপর ২০০৯ সালের শেষের দিকে বিদ্যালয়টি পাশে একটি টিনসেড ঘর তোলা হয়। এরপর থেকে টানা ১০ বছর ধরে ভাঙা টিনশেড ঘরেই বিদ্যালয়ের কার্যক্রম পরিচালনা করা হয়।

সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়, বিদ্যালয়ের টিনসেড ঘরের পাশেই জরাজীর্ণ অবস্থায় পড়ে আছে মূল ভবনটি। ভবনটির সামনে এখনো জাতীয় পতাকা তোলা হয়। তবে ভবনটির ভিতরে বসবাস করে কয়েকটি গবাদিপশু। ভবনের তিনটি কক্ষে গবাদিপশুর খাবার মজুদ রাখতে দেখা গেছে। এছাড়াও বিদ্যালয়টি টিনসেড ঘরে অবকাঠামো সংকটসহ নানা সমস্যায় জর্জরিত। ফলে শিক্ষার্থীর উপস্থিতি খুবই কম দেখা গেছে।

কহিনুর বেগম নামে এক অভিভাবক বলেন, ‘দীর্ঘদিন যাবৎ বিদ্যালয়টিতে নেই স্বাস্থ্য সম্মত টয়লেট- বাথরুম, নেই শিক্ষার্থীদের পর্যাপ্ত বেঞ্চ। একটা টিনের ঘর, তাও ভাঙাচুড়া। এভাবে কি সুস্থ শরীরে বাচ্চারা পড়ালেখা করতে পারে?’

৫ম শ্রেণির শিক্ষার্থী নাইমুল ইসলাম ও ৪র্থ শ্রেণির শিক্ষার্থী আব্দুর রহিম জানায়, সামান্য বৃষ্টি হলে ফুটো চালা দিয়ে পানি পড়ে ভিজে যায় তাদের বই খাতা। গরমের দিনে নেই কোন ফ্যান। এর মধ্যে তাদের ক্লাস করতে খুব কষ্ট হয়। স্বাস্থ্যসম্মত টিউবওয়েল ও শৌচাগার নেই। তাই তাদের আশে পাশের বাড়ি ঘরে যেতে হয়।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক শিক্ষিকা বলেন, ‘জরাজীর্ণ টিনশেড ঘরে ক্লাস নিচ্ছে শিক্ষকরা। চালা ফুটো থাকায় বর্ষার দিনে টপটপ করে পানি পড়ে। চেয়ার-টেবিল ও বেঞ্চগুলোর নাজুক অবস্থা। দরজা-জানালাসহ বিভিন্ন অবকাঠামো ভেঙে পড়েছে। এক সময় এ বিদ্যালয়ে শিক্ষার্থীদের উপস্থিতি ছিল শতভাগ ও শিক্ষার্থীদের স্কুল ড্রেসও ছিল শতভাগ। কিন্তু এখন ভাঙ্গা বেঞ্চে ও মাটিতে বসেই পড়ালেখা করতে হচ্ছে। এর ফলে শিক্ষার্থীরা স্কুলে আসতে আগ্রহ হারাচ্ছে।’

হাওলাদারকান্দি এলাকার বাসিন্দা মো. সোহাগ হোসেন বলেন, স্কুলটি এলাকার শিক্ষার মান উন্নয়নে ভূমিকা পালন করছে। ভালো কিছুর আশায় বিদ্যালয়ে ছেলে মেয়েদের ভর্তি করানো হয়। কিন্তু নানা সমস্যা থাকায় একদিকে যেমন ছাত্র-ছাত্রীদের কষ্ট হচ্ছে অন্যদিকে শিক্ষকেরাও ভোগান্তির মধ্যে পড়ছেন। তাই আমরা বিদ্যালয়ের অবকাঠামো উন্নয়ন ও সমস্যা সমাধানে সরকারের দৃষ্টি কামনা করছি।’
বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক গিয়াস উদ্দিন বলেন, ‘২০০৯ সাল থেকে জরাজীর্ণ অবস্থায় পড়ে থাকা মূল ভবনটি ৩ বার নিলামে তোলা হয়। তবে নিলামের তোলা হলেও তা ভেঙে নেয়নি। পরে কালকিনি উপজেলায় এমপির বরাদ্দে ১১টা স্কুল আসে তখন আমাদের স্কুলের ভবনের কাজ করবে বলে মাপ ও মাটির পরীক্ষা করে নেয় হয়। এরপরে তার কোন বাস্তবায়ন নেই।’

তিনি আরো বলেন, ‘বর্তমানে যে টিনশেড ঘরে ক্লাস নেয়া হচ্ছে সেটিও বছর দুয়েক আগে ঘূর্ণিঝড়ে ভেঙে যায়। পরে জোড়াতালি দিয়ে মেরামত করা হয়। পড়ালেখা করতে গিয়ে নানা প্রতিকূলতায় ভুগতে হয় শিক্ষার্থীদের।’

প্রায় এক বছর ধরে কালকিনি উপজেলা শিক্ষা কর্মকর্তা হিসাবে মো. শহিদুল ইসলাম যোগদান করলেও বিদ্যালয়টির বিষয় তিনি কিছুই জানেন না। তিনি বলেন, ‘১৮২নং পশ্চিম কালিনগর হাওলাদারকান্দি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের বিষয় আমি আগেপড়ে কিছু শুনিনি। ওই স্কুলে পরিদর্শনেও যাওয়া হয়নি। যেহেতু আপনাদের মাধ্যমে খবর এলো আমরা ওখানে যাব। যদি শিক্ষার্থীদের পাঠদানে সমস্যা হয়ে থাকে তাহলে তাৎক্ষণিক ব্যবস্থা নেয়া হবে। এছাড়াও মূল ভবনটি জরাজীর্ণ অবস্থায় নিলামে তোলা হলেও কেন ভাঙা হলো না বিষয়টি খতিয়ে দেখা হবে।’