Vasa Andolon
ছবি: সংগৃহীত।

মোহাম্মদ রাহাত হোসেন:
১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলন একটি সাংস্কৃতিক আন্দোলন হিসেবে শুরু হলেও কালক্রমে তা রাজনৈতিক আন্দোলনের রূপ পরিগ্রহ করে এবং বাঙালিকে অধিকার সচেতন করে তোলো। ১৯৫২ সালের পরবর্তী প্রতিটি আন্দোলনে তথা ১৯৫৪ সালের নির্বাচনে, ১৯৬২ এর শিক্ষা আন্দোলন, ১৯৬৬ এর ছয়-দফার স্বাধিকার আন্দোলনে, ১৯৬৯ এর গণআন্দোলনে এবং ১৯৭১ সালের মহান স্বাধীনতা যুদ্ধে ভাষা আন্দোলন বাঙালিকে অনুপ্রাণিত করেছে। ভাষা আন্দোলন থেকে পাকিস্তানের ধ্বংসের সূত্রপাত হয় এবং ১৯৭১ সালে স্বাধীন রাষ্ট্র বাংলাদেশের জন্মের মধ্যে দিয়ে তা শেষ হয়। তাই ১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলনের মধ্যেই স্বাধীন বাংলাদেশের বীজ নিহিত ছিল।

ভারতীয় উপমহাদেশে মুসলমানদের জন্য একটি আলাদা আবাসভূমি দরকার- এই শ্লোগানের ভিত্তিতে পাকিস্তান রাষ্ট্রের জন্ম হয়। স্বভাবতই ধর্মই ছিল পাকিস্তানের জাতীয়তার ভিত্তি। ১৯৫১ সালের আদমশুমারি রিপোর্ট অনুযায়ী পশ্চিম পাকিস্তানের প্রায় ৯৭% এবং পূর্ববাংলার ৮০% ছিল মুসলমান। কিন্তু অধিকাংশ অধিবাসীর ধর্ম এক হলেও তাদের ভাষা ছিল ভিন্ন।

তৎকালীন পাকিস্তানের সংখ্যাগরিষ্ঠ তথা ৫৬.৪০ শতাংশ অধিবাসীর ভাষা বাংলাকে বাদ দিয়ে অতি নগণ্য সংখ্যক অর্থাৎ মাত্র ৩.২৭ শতাংশ অধিকাবসীর ভাষা উর্দুকে রাষ্ট্রভাষা করার ষড়যন্ত্রের বিরুদ্ধে পূর্ব বাংলায় ১৯৪৭ সাল থেকে ১৯৫২ সাল পর্যন্ত যে আন্দোলন পরিচালিত হয় তার নাম ভাষা আন্দোলন। এই আন্দোলন উর্দুর সাথে বাংলা ভাষাকেও পাকিস্তানের অন্যতম রাষ্ট্রভাষা করা প্রধান উদ্দেশ্য থাকলেও তা পরবর্তীতে মহান স্বাধীনতা সংগ্রাম পর্যন্ত ভূমিকা রাখে। ১৯৫২ সালে ২১ ফেব্রুয়ারি বুকের রক্ত দিয়েই বাঙালিকে তার দাবি প্রতিষ্ঠা করতে হয়।

১৯৫২ সালের ২১ ফেব্রুয়ারি বৃহস্পতিবার, ৮ ফাল্গুন ১৩৫৮ বঙ্গাব্দ, ২৪ জমাদিয়ুল আউয়াল ১৩৭১ হিজরি। পূর্ব ঘোষণানুযায়ী ২১ ফেব্রুয়ারি ছাত্ররা দলে দলে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রাঙ্গনে সমবেত হতে থাকে। রাস্তায় ১৪৪ ধারা জারি থাকায় বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান থেকে ছাত্ররা দুজন দুজন করে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় অভিমুখে আসে। খন্ড মিছিলগুলো যখন ১৪৪ ধারা ভাঙতে পথে নামছিল তখন রাস্তায় অপেক্ষমাণ পুলিশ তাদেরকে গ্রেফতার করে ট্রাকে তুলে নিয়ে যায়। কিন্তু কতজনকে পুলিশ আটক করবে? অবশেষে পুলিশ মিছিলকারীদের উপর বেপরোয়া লাঠিচার্জ শুরু করে। এতেও মিছিলকারীদের ঠেকাতে না পেরে নিক্ষেপ করে শত শত কাঁদুনে গ্যাস। পুলিশি হামলার মুখে ছাত্ররা ছত্রভঙ্গ হয়ে যায়। কিন্তু অল্প সময়ের মধ্যে তারা ‘ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ও মেডিকেল কলেজের মাঝখানের অনুচ্চ প্রাচীর টপকে মেডিকেল হোস্টেলের প্রধান ফটকের কাছে আবার জমায়েত হন।’ উদ্দেশ্য ছিল পূর্ববাংলা আইন পরিষদে যোগদানকারী সদস্যদের কাছে বাংলাভাষার দাবির কথা পৌঁছে দেয়া। …প্রায় বেলা ২টা পর্যন্ত মিছিল করে ছাত্ররা বীরত্বের সঙ্গে গ্রেফতারী বরণ করতে থাকে। বেলা প্রায় সোয়া তিনটার সময় এম.এল.ও ও মন্ত্রীর মেডিকেল কলেজের সামনে দিয়ে পরিষদে আসতে থাকেন। ছাত্ররা যতই শ্লোগান দেয় আর মিছিলে একত্রিত হয় ততই পুলিশ হানা দেয়। কয়েকবার ছাত্রদের উপর কাঁদুনে গ্যাস ছেড়ে তাড়া করতে করতে মেডিকেল কলেজ হোস্টেলের ভিতর ঢুকে পড়ে। হোস্টেল প্রাঙ্গণে ঢুকে ছাত্রদের উপর আক্রমণ করে পুলিশ গুলিবর্ষণ করে পুলিশ। ঘটনাস্থলেই আবদুল জব্বার ও রফিকউদ্দিন আহমদ শহীদ হন। আর ১৭ জনের মতো গুরুতর আহত হন। তাদের হাসপাতালে সরানো হয়। তাদের মধ্যে রাত আটার সময় আবুল বরকত শহীদ হন।

ইউনেস্কোর সাধারণ পরিষদের সদস্য ১৮৮টি দেশ সর্বসম্মত সিদ্ধান্তে ১৭ নভেম্বর’ ১৯৯৯ সালে ২১ ফেব্রুয়ারিকে আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবসের মর্যাদা লাভ করে। এর পরবর্তী বছর অর্থাৎ ২০০০ সালের ২১ ফেব্রুয়ারি থেকে জাতিসংঘসহ বিশ্বের ১৮৮টি দেশ প্রথমবারের মতো আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস পালন কর। সেই সময় থেকে প্রতি বছরই সারাবিশ্বে দিবসটি পালিত হচ্ছে।

বাংলাদেশের স্বাধীনতা সংগ্রামের ইতিহাসে ১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলনের তাৎপর্য অপরিসীম। ভাষা আন্দোলন পাকিস্তানের রাজনীতিতে এক সুদূরপ্রসারী প্রভাব ফেলে। ভাষা আন্দোলনের সঙ্গে রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও সাংবিধানিক প্রশ্নও জড়িয়ে পড়ে। বাংলাভাষার প্রশ্নে মুসলিম লীগের বৈরী মনোভাবের কারণে এই দল থেকে গণতন্ত্রী দল, যুবলীগ, আওয়ামী লীগ প্রভৃতি নতুন নতুন দলের সৃষ্টি হওয়ায় পূর্ববাংলায় মুসলিম লীগের প্রাধান্য খর্ব হয়। ফলে ১৯৫৪ সালের পূর্ববাংলা প্রাদেশিক পরিষদের নির্বাচনে এই দলের চরম পরাজয় ঘটে।

ভাষা আন্দোলন প্রথম পর্যায়ে একটি সাংস্কৃতিক আন্দোলন ছিল। কিন্তু কালক্রমে এটি রাজনৈতিক রূপ পরিগ্রহ করে। অনেক রাজনৈতিক দল ও রাজনীতিবিদ এই আন্দোলনের সঙ্গে জড়িয়ে পড়েন। ফলে পূর্ববাংলায় স্বাধিকারের চিন্তাচেতনা শুরু হয়। পরবর্তীতে আন্দোলনসমূহে ভাষা আন্দোলন প্রেরণা হিসেবে কাজ করে। ভাষা আন্দোলন এক ধরণের প্রাদেশিকতাবাদের জন্ম দেয়। এরপর যখনই পূর্ববাংলার স্বার্থসংশ্লিষ্ট কোনো দাবি উচ্চারণ করা হয়েছে তখনই পূর্ববাংলাবাসীর সমর্থন অর্জন করেছে।
১৯৫২ সালের ২১ ফেব্রুয়ারি ছিল বাংলাদেশের প্রথম গণচেতনার সুসংগঠিত সফল গণঅভ্যুত্থান। এই আন্দোলন থেকে পূর্ব বাংলার রাজনীতি ও সংস্কৃতি নতুন ধারায় প্রবাহিত হয়। পাকিস্তানের প্রতি মোহ এবং রাজনীতিতে ধর্মীয় আচ্ছন্নতা দ্রুতগতিতে কেটে যেতে থাকে। ধীরে ধীরে স্বায়ত্বশাসনের দাবি দানা বাঁধতে শুরু করে।

পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার পর ভাষা আন্দোলনকে কেন্দ্র করেই বাঙালি জাতি সর্বপ্রথম অধিকার সচেতন এবং সংগ্রামের অগ্নিমন্ত্রে দীক্ষিত হয়ে উঠে। পূর্ব বাংলার স্বার্থসংশ্লিষ্ট দাবিতে জনগণ ঐক্যবদ্ধ হতে থাকে।
ভাষা আন্দোলন পূর্ব বাংলায় মধ্যবিত্ত বাঙালি সমাজের ভূমিকা উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি করে। যা পূর্ব বাংলায় ছাত্রসমাজকে রাজনৈতিক শক্তিতে রূপান্তরিত করে। এই ঘটনার দুই মাসের মধ্যে ছাত্র ইউনিয়ন নামে একটি নতুন ছাত্র সংগঠন আত্মপ্রকাশ করে। পরবর্তীতে প্রতিটি আন্দোলন-সংগ্রামে ছাত্রসমাজই মুখ্য চালকের ভূমিকা পালন করেছে।

ভাষা আন্দোলনের মাধ্যমেই বাঙালিরা তাদের পৃথক জাতিস্বত্বা সম্পর্কে সচেতন হয়। এ আন্দোলন জন্ম দেয় ভাষাভিত্তিক বাঙালি জাতীয়তাবাদের, যা সাম্প্রদায়িক ধর্মীয় জাতীয়তাবাদের সম্পূর্ণ বিপরীত। এর মধ্য দিয়ে গণতান্ত্রিক মূল্যবোধ, জাতীয় ধন্যাধারণা ও অসাম্প্রদায়িক চেতনার সূত্রপাত ঘটে যা পরবর্তী সকল আন্দোলনের পাথেয় হিসেবে কাজ করে।

আসলে ১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলন একটি সাংস্কৃতিক আন্দোলন হিসেবে শুরু হলেও কালক্রমে তা রাজনৈতিক আন্দোলনের রূপ পরিগ্রহ করে এবং বাঙালিকে অধিকার সচেতন করে তোলে। ১৯৫২ সালের পরবর্তী প্রতিটি আন্দোলনে তথা ১৯৫৪ সালের নির্বাচনে, ১৯৬২ এর শিক্ষা আন্দোলন, ১৯৬৬ এর ছয়-দফার স্বাধিকার আন্দোলনে, ১৯৬৯ এর গণআন্দোলনে এবং ১৯৭১ সালের মহান স্বাধীনতা যুদ্ধে ভাষা আন্দোলন বাঙালিকে অনুপ্রাণিত করেছে। ভাষা আন্দোলন থেকে পাকিস্তানের ধ্বংসের সূত্রপাত হয় এবং ১৯৭১ সালে স্বাধীন রাষ্ট্র বাংলাদেশের জন্মের মধ্যে দিয়ে তা শেষ হয়। তাই ১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলনের মধ্যেই স্বাধীন বাংলাদেশের বীজ নিহিত ছিল।

লেখক: প্রভাষক, ইতিহাস বিভাগ, কালকিনি সৈয়দ আবুল হোসেন কলেজ, কালকিনি, মাদারীপুর ও প্রকাশক, বাংলারশিক্ষা.কম।
তথ্যসূত্র:
ভাষা আন্দোলন থেকে স্বাধীনতা: এম.আর.আখতার মুকুল;
বাংলাদেশের ইতিহাস ১৯৪৭-৭১: ড. মো. মাহবুবর রহমান;
বাংলাদেশের ইতিহাস (প্রাচীনকাল থেকে ১৯৭১ পর্যন্ত): দিলীপ কুমার সাহা, ড. মো. শাহজাহান, মো. আনারুল হক প্রাং; কারেন্ট অ্যাফেয়ার্স, ফেব্রুয়ারি ২০১২;
সাপ্তাহিক আনন্দবাংলা, ১২ ফেব্রুয়ারি ২০১২