madaripur-bikhob-pic-16-04-

রাহাত হোসাইন, বাংলারশিক্ষা:
সর্বশেষ ২০১১ সালে আদমশুমারী হয়েছিল এবং সে হিসেবে মাদারীপুর জেলার জনসংখ্যা ১২ লাখ ১২ হাজার ১৯৮ জন। মাদারীপুর জেলার পরিসংখ্যান অফিসের উপ-পরিচালকের দেওয়া তথ্য মতে, সদর উপজেলায় ৩৫৯৮১২ জন, কালকিনি উপজেলায় ২৮৪২৪৫ জন, রাজৈর উপজেলায় ২৩৭৪৫৮ জন এবং শিবচর উপজেলায় ৩৩০৬৮৩ জন। কিন্তু দীর্ঘ ৯ বছরে মধ্যে নতুন কোন আদমশুমারী না হওয়ার কারণে মাদারীপুর জেলার বর্তমান জনসংখ্যা তথ্য পাওয়া যায় নাই। তাই মাদারীপুর জেলার বর্তমান জনসংখ্যার অনুপাতে দারিদ্র্যের হার সঠিকভাবে নির্ণয় করা সম্ভব নয়।

যেহেতু আমাদের এই বিশ্লেষণ দারিদ্র্য পরিবারের মধ্যে করোনা প্রভাবের কারণে ত্রাণ বা খাদ্য সামগ্রী বিতরণ সংশ্লিষ্ট তাই জেলার জনসংখ্যার সঠিক তথ্য না হলেও ক্ষতি নেই। কারণ যেসকল পরিবারের মধ্যে বা যাদের মধ্যে খাদ্য সামগ্রী বিতরণ করা হয় তারা সকলেই মাদারীপুর জেলার ভোটার। এ জন্য মাদারীপুর জেলার সংসদীয় আসনের সর্বশেষ নির্বাচনের খসড়া ভোটার তালিকা অনুযায়ী তথ্য বিশ্লেষণ করা হয়েছে।

মাদারীপুর-১
শিবচর উপজেলার শিবচর পৌরসভা ও ১৯টি ইউনিয়ন নিয়ে গঠিত মাদারীপুর-১ আসন গঠিত। বাংলাদেশ নির্বাচন কমিশনের গত ২০১৮ সালের সংসদ নির্বাচনের খসড়া ভোটার তালিকা অনুযায়ী মোট ভোটার সংখ্যা ২ লাখ ৪৫ হাজার ২৭৪ জন। এর মধ্যে পুরুষ ১ লাখ ২৫ হাজার ৬৬২ জন এবং মহিলা ১ লাখ ১৯ হাজার ৬১২ জন।

বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) সর্বশেষ খানার আয় ও ব্যয় নির্ধারণ জরিপ ২০১৬ অনুযায়ী মাদারীপুর জেলা কম দারিদ্র্যের দিক থেকে বাংলাদেশের অবস্থান থেকে তৃতীয়। অর্থাৎ যদি বলি ধনীদের তালিকায় মাদারীপুর জেলায় বাংলাদেশের মধ্যে তৃতীয় অবস্থান রয়েছে। পরিসংখ্যান বুরোর জরিপ অনুযায়ী মাদারীপুর জেলায় দারিদ্র্য জনগোষ্ঠার সংখ্যা ৩ দশমিক ৭ ভাগ। সে হিসাবে যদি আমরা মাদারীপুর-১ আসনের ভোটার সংখ্যায় এ হিসাব করি তাতে মাদারীপুর-১ আসনের ভোটারদের মধ্যে দারিদ্র্য রয়েছে ৯ হাজার ৭৫ জন।

মাদারীপুর-২
মাদারীপুর সদর ও রাজৈর উপজেলার দুটি পৌরসভা (মাদারীপুর ও রাজৈর পৌরসভা) ও ২১টি ইউনিয়ন নিয়ে গঠিত। বাংলাদেশ নির্বাচন কমিশনের গত ২০১৮ সালের সংসদ নির্বাচনের খসড়া ভোটার তালিকা অনুযায়ী মোট ভোটার সংখ্যা ৩ লাখ ৪১ হাজার ৮৫৭ জন। এর মধ্যে পুরুষ ১ লাখ ৭৩ হাজার ৯৬১ জন এবং মহিলা ১ লাখ ৬৭ হাজার ৮৯৬ জন।

বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) সর্বশেষ খানার আয় ও ব্যয় নির্ধারণ জরিপ ২০১৬ অনুযায়ী মাদারীপুর জেলায় দারিদ্র্য জনগোষ্ঠার সংখ্যা ৩ দশমিক ৭ ভাগ। সে হিসাবে যদি আমরা মাদারীপুর-২ আসনের ভোটার সংখ্যায় এ হিসাব করি তাতে মাদারীপুর-২ আসনের ভোটারদের মধ্যে দারিদ্র্য রয়েছেন ১২ হাজার ৬৪৯ জন।

মাদারীপুর-৩
কালকিনি উপজেলা ও সদর উপজেলা (অংশ) একটি পৌরসভা ও ২০টি ইউনিয়ন নিয়ে গঠিত। এর মধ্যে সদর উপজেলার ৫টি ইউনিয়ন ও কালকিনি উপজেলার ১৫টি ইউনিয়ন। বাংলাদেশ নির্বাচন কমিশনের গত ২০১৮ সালের সংসদ নির্বাচনের খসড়া ভোটার তালিকা অনুযায়ী মাদারীপুর-৩ আসনের মোট ভোটার সংখ্যা ২ লাখ ৯৭ হাজার ৪৪৪ জন। এর মধ্যে পুরুষ ১ লাখ ৫২ হাজার ২৮০ জন এবং মহিলা ১ লাখ ৪৫ হাজার ২৮০ জন।

বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) সর্বশেষ খানার আয় ও ব্যয় নির্ধারণ জরিপ ২০১৬ অনুযায়ী মাদারীপুর জেলায় দারিদ্র্য জনগোষ্ঠির সংখ্যা ৩ দশমিক ৭ ভাগ। সে হিসাবে যদি আমরা মাদারীপুর-৩ আসনের ভোটার সংখ্যায় এ হিসাব করি তাতে মাদারীপুর-৩ আসনের ভোটারদের মধ্যে দারিদ্র্য রয়েছেন ১১ হাজার ৫ জন।

বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর জরিপ অনুযায়ী মাদারীপুর জেলার ভোটারদের মধ্যে সর্বমোট দারিদ্র্য মানুষের সংখ্যা হচ্ছে মাদারীপুর-১ আসনে ৯ হাজার ৭৫ জন, মাদারীপুর-২ আসনে ১২ হাজার ৬৪৯ জন ও মাদারীপুর-৩ আসনে ১১ হাজার ৫ জন অর্থাৎ মাদারীপুর জেলার তিনটি আসনের ভোটাদের মধ্যে মোট দারিদ্র্য মানুষ ৩২ হাজার ৭২৯ জন।
করোনা ভাইরাসের কারণে সারা পৃথিবীর মানুষ আজ বির্পযস্ত। এখন পর্যন্ত সারা পৃথিবীতে কোভিড-১৯ ভাইরাসে আক্রান্ত হয়ে মারা গেছেন প্রায় ১ লাখ ৭০ হাজার মানুষ। পাশাপাশি বেকার হয়েছেন লক্ষ লক্ষ মানুষ।

সারা পৃথিবীর পাশাপাশি করোনা ভাইরাসের প্রভাবও পড়েছে বাংলাদেশে। আইইডিসিআর এর তথ্য অনুযায়ী এ রিপোর্ট লেখা পর্যন্ত বাংলাদেশে এ পর্যন্ত ১০১ জন মানুষ কোভিড-১৯-এ আক্রান্ত হয়ে মৃত্যুবরণ করেছেন এবং আক্রান্ত হয়েছেন ২ হাজার ৯৪৮ জন। পাশাপাশি অঘোষিত ভাবে গত প্রায় এক মাস যাবৎ বন্ধ রয়েছে পুরো অর্থনৈতিক কর্মকান্ড। এর ফলে সবচেয়ে বেশি অসহায় হয়ে পড়েছেন দেশের হৃতদরিদ্র দিনমজুর মানুষগুলো।

সর্বপ্রথম বাংলাদেশের মধ্যে করোনা ভাইরাসের রোগী শনাক্ত হয়েছে মাদারীপুর জেলায়। তাই বাংলাদেশের মধ্যে সর্বপ্রথম মাদারীপুর জেলার শিবচর উপজেলাকে লকডাউন ঘোষণা করা হয় এবং অঘোষিত ভাবে প্রাথমিক পর্যায় সমস্ত জেলাই লকডাউন কার্যকর হয়। এর ফলে দিনমজুর ও হৃতদরিদ্র মানুষগুলোর দৈনন্দিন আয়ের উৎস বন্ধ হয়ে যায়। যার ফলে খেটে-খাওয়া মানুষগুলোও পড়ে যান খাদ্য সংকটে।

এই সংকট থেকে উত্তোরণ ও হৃতদরিদ্র মানুষ যেন করোনা প্রার্দুভাবের কারণে না খেয়ে থাকেন তার জন্য সরকার বিভিন্ন কর্মসূচি ঘোষণা করেন। হৃতদরিদ্র মানুষের জন্য প্রদান করা হচ্ছে খাদ্য সহায়তা। মাদারীপুর জেলাতে সরকার ঘোষিত এসব কর্মসূচি শুরু হয়। মাদারীপুর জেলার জন্য সরকার প্রদান করেন খাদ্য সামগ্রী।

মাদারীপুর জেলার সাংবাদিকদের বিভিন্ন তথ্য, বিভিন্ন মিডিয়া ও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে প্রকাশিত তথ্যের ভিত্তিতে মাদারীপুর জেলার হৃতদরিদ্র মানুষের মাঝে খাদ্য সামগ্রী বিতরণ করার বিভিন্ন তথ্য প্রকাশিত হয়েছে। এসব তথ্য বিশ্লেষণ করে দেখা যায় যায়, মাদারীপুর জেলায় ত্রাণ বিতরণ করেছেন সংসদ সদস্যরা, মাদারীপুর জেলা প্রশাসন, পুলিশ প্রশাসন, জেলা পরিষদ, উপজেলা প্রশাসন, পৌরসভা, রাজনৈতিক দল ও তার সহযোগী সংগঠন, যুবলীগ, যুবদল, ছাত্রলীগ, বিভিন্ন সামাজিক সংগঠন, এছাড়া ব্যক্তিগতভাবে বিভিন্ন জনপ্রতিনিধি যেমন- মেয়র, জেলা পরিষদের সদস্য, কাউন্সিলর, বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের সদস্য ও বিভিন্ন সমাজসেবক।

অনেক মানুষ এই দুর্যোগকালীন সময়ে খাদ্য সামগ্রী নিয়ে অসহায় মানুষের মাঝে পাশে দাঁড়িয়েছেন। আবার জেলার অনেক স্থানে দেখা গেছে এসব হৃতদরিদ্র মানুষের নামে বরাদ্দকৃত খাদ্য সামগ্রীও আত্মসাতে এগিয়ে আছেন এক শ্রেণির মানুষ।

আমরা যদি পরিসংখ্যান ব্যুরোর জরিপ অনুযায়ী তথ্য অনুযায়ী বিশ্লেষণ করি তাহলে মাদারীপুর জেলার মোট দারিদ্র্য মানুষের সংখ্যা ৩২ হাজার ৭২৯ জন। আর যদি আমরা ত্রাণ বা সহযোগিতায় এগিয়ে এসে খাদ্য সামগ্রী বিতরণের একটি সংখ্যা অনুমান করি তাহলেও সে সংখ্যাও নিতান্তই কম না। বিশেষ করে আমরা সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে যেভাবে মানুষের দ্বারে দ্বারে গিয়ে কিংবা সমাবেশ করে খাদ্য সামগ্রী বিতরণের ছবি দেখি তাতেও তো এসংখ্যা কত হবে তা অনুমান করাও কষ্টকর।

এতো প্রতিষ্ঠান, সংগঠন ও ব্যক্তি মানুষ এগিয়ে এসেছেন হৃতদরিদ্র মানুষের কষ্টলাঘবের জন্য, করোনা ভাইরাসের প্রাদুর্ভাবের কারণে যাতে তারা না খেয়ে থাকেন তার জন্য।
পরিসংখ্যান ব্যুরোর তথ্য অনুযায়ী মাদারীপুরের ভোটারদের মাত্র ৩২ হাজার ৭২৯ জন মানুষ দারিদ্র্য। তবে অত্যন্ত দুঃখ ও পরিতাপের বিষয়ে এই স্বল্প সংখ্যক মানুষ দারিদ্র্য হওয়া সত্ত্বেও ত্রাণের দাবিতে মাদারীপুর জেলার বেশ কয়েকটি এলাকায় বিক্ষোভ করেছেন দারিদ্র্য মানুষ।

এতো খাদ্য সামগ্রী বিতরণের পরও কেন এই বিক্ষোভ। তাহলে নিশ্চয়ই এসব খাদ্য সামগ্রী বিতরণের রয়েছে অনিয়ম, স্বজনপ্রীতি বা অতিরঞ্জিতভাবে ত্রাণ বিতরণের তথ্য প্রকাশ।
মাদারীপুর জেলা প্রশাসক কার্যালয়ের ত্রাণ বিভাগের সোমবার দুপুরে প্রদত্ত তথ্য মতে, করোনা প্রাদুর্ভাবের কারণে জেলায় মোট ৮৬৫ মেঃ টন জি.আর চাল বরাদ্দ পাওয়া গেছে এবং জি.আর ক্যাশ (নগদ অর্থ) ২৯ লাখ ১০ হাজার টাকা। এছাড়াও শিশু খাদ্যের জন্য বরাদ্দ এসেছে ৫ লাখ টাকা।

ত্রাণ বিভাগ থেকে আরও জানা যায়, এসব বরাদ্দের মধ্যে মাদারীপুর সদর উপজেলায় প্রদান করা হয়েছে ১৮১ মেঃ টন জি.আর চাল ও নগদ ৬ লাখ ১ হাজার টাকা। কালকিনি উপজেলায় বরাদ্দ দেয়া হয়েছে ১৮০ মেঃ টন জি.আর চাল ও নগদ ৫ লাখ ৫০ হাজার টাকা। রাজৈর উপজেলায় বরাদ্দ দেয়া হয়েছে ১৪৩ মেঃ টঃ জি.আর চাল ও নগদ ৫ লাখ ৫০ হাজার টাকা। সবচেয়ে বেশি বরাদ্দ প্রদান করা হয়েছে শিবচর উপজেলায়। সেখানে প্রদান করা হয়েছে ২৬২ মেঃ টন জি.আর চাল ও নগদ ৮ লাখ ২৫ হাজার টাকা।

এছাড়া মাদারীপুর পৌরসভায় জেলার বরাদ্দ থেকে প্রদান করা হয়েছে ২৫ মেঃ টন জি.আর চাল এবং নগদ ৬০ হাজার টাকা। কালকিনি পৌরসভায় ১৪ মেঃ টন জি.আর চাল ও নগদ ৫০ হাজার টাকা। রাজৈর পৌরসভায় ১২ মেঃ টন চাল এবং নগদ ৬০ হাজার টাকা।

ত্রাণ বিভাগের প্রদত্ত তথ্য অনুযায়ী আরও জানা যায়, শিশু খাদ্য বাবদ বরাদ্দকৃত নগদ অর্থ থেকে সদর উপজেলায় ১ লাখ ১০ হাজার ১শ টাকা, কালকিনি উপজেলায় ৮৯ হাজার ৩শ’ টাকা, রাজৈর উপজেলায় ৭৬ হাজার ৬শ’ এবং শিবচর উপজেলায় ১ লাখ ২ হাজার টাকা বরাদ্দ প্রদান করা হয়েছে।

জেলার ৪টি উপজেলা ও ৪টি পৌরসভায় সর্বমোট ৮৩১ মেঃ টন জি.আর চাল ও নগদ ২৭ লাখ ৪১ হাজার টাকা বরাদ্দ প্রদান করা হয়েছে। এছাড়া শিশু খাদ্য বাবদ ৪টি উপজেলায় নগদ ৩ লাখ ৭৮ হাজার টাকা বরাদ্দ দেওয়া হয়।

মাদারীপুর জেলা পরিষদ সূত্র জানা যায়, জেলা পরিষদের পক্ষ থেকে মাদারীপুর জেলায় ৫ হাজার মানুষকে খাদ্য সহায়তা ও ১০ হাজার মানুষকে সুরক্ষা সামগ্রী প্রদান করা হয়েছে।

এসব সরকারি বরাদ্দের বাহিরেও ব্যক্তিগত তহবিল থেকে মাদারীপুর জেলায় খাদ্য সহায়তা প্রদান করেছেন সংসদ সদস্যগণ, জনপ্রতিনিধি, রাজনৈতিক ও সহযোগী সংগঠনের নেতৃবৃন্দ, বিভিন্ন সামাজিক সংগঠন ও বিভিন্ন সমাজসেবকগণ।

বিভিন্ন তথ্য বিশ্লেষণ করে দেখা যায়, এতো বিপুল পরিমান খাদ্য সহায়তা ও এতো মানুষের খাদ্য সামগ্রী বিতরণের তথ্য মিডিয়া ও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে প্রকাশিত হওয়ার পরও কেন হৃতদরিদ্র মানুষ খাদ্যের জন্য বিক্ষোভ করছে।

সরেজমিন ও বিভিন্ন তথ্য বিশ্লেষণ করে সরকারি ও বেসরকারি এসব ত্রাণ বিতরণের ক্ষেত্রে অনেকগুলো বিষয় পরিলক্ষিত হচ্ছে। এগুলোর মধ্যে রয়েছে সঠিক তালিকার অভাব, বরাদ্দ আত্মসাৎ, বিতরণে অনিয়ম, একই ব্যক্তির একাধিকবার সহায়তা গ্রহণ আর খাদ্য সহায়তা বিতরণের চেয়ে অধিক প্রচারণা।

তথ্য বিশ্লেষণে দেখা গেছে, সরকারি ও বেসরকারিভাবে বিতরণকৃত সহায়তার নেই কোন সুনির্দিষ্ট তথ্য। কোন কোন এলাকায় কাদের মধ্যে সহায়তা প্রদান করা হলো তার কোন তালিকা নেই।

দেখা যাচ্ছে, একজন ব্যক্তি সরকারি বরাদ্দ পেয়েছেন আবার বেসরকারিভাবে একাধিক ব্যক্তি থেকে সহায়তা পেয়েছেন। আবার এমন ব্যক্তি রয়েছেন যারা কোন প্রকার সহায়তা পান নাই। আবার এমন এলাকা রয়েছে যেখানে সরকারি ও বেসরকারি উভয় বরাদ্দ পেয়েছেন। আবার অনেক এলাকায় কোন বরাদ্দই পৌঁছায়নি।

এছাড়াও একশ্রেণির মানুষ রয়েছেন যাদের ঘরে খাবার নেই কিন্তু হৃতদরিদ্র মানুষের জন্য রাস্তায় গিয়ে বিক্ষোভ করতে পারেন না। এমনকিও ত্রাণ বিতরণের সারিতে লাইনে দাঁড়িয়েও খাবার সংগ্রহ করতে পারেন না। তারা রয়েছেন সবচেয়ে বেশি দুর্ভোগ ও কষ্টের মধ্যে।

এছাড়া দেখা যাচ্ছে, অনেক জনপ্রতিনিধিদের যে পরিমান সরকারি বরাদ্দ দেয়া হচ্ছে সে পরিমান সহায়তা হৃতদরিদ্রদের মাঝে বিতরণ না করে নিজ ও নিজের দলের নেতা-কর্মীদের মধ্যে ভাগ-ভাটোয়ারা করেছেন। অনেক জনপ্রতিনিধির বিরুদ্ধে রয়েছে সরকারি বরাদ্দ আত্মসাতের অভিযোগ।

অন্যদিকে, বিভিন্ন সংগঠন ও ব্যক্তি পর্যায়ে যেসব খাদ্য সহায়তা প্রদান করা হয়েছে সেগুলোর ক্ষেত্রে দেখা গেছে যতটা না বিতরণে হয়েছে তার চেয়ে অধিকমাত্রায় বিভিন্ন মিডিয়া ও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে প্রচার করা হচ্ছে। বিশেষ করে খাদ্য সহায়তা প্রদানের ক্ষেত্রে ছবি তোলার প্রবণতা মহামারী আকার ধারণ করেছে।

করোনা ভাইরাসের বিস্তার রোধ করা যেমন সরকারের একটি আবশ্যকীয় ও চ্যালেজিং হয়ে দাঁড়িয়েছে। তার পাশাপাশি হৃতদরিদ্র মানুষের মধ্যে সঠিকভাবে খাদ্য সহায়তা পৌঁছানো এখন প্রশাসনের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। তাই হৃতদরিদ্র ও ক্ষুধার্তদের মাঝে খাদ্য সহায়তা সঠিকভাবে পৌঁছানোর জন্য সরকারি, বেসরকারি ও ব্যক্তি পর্যায়ের সমস্ত খাদ্য সহায়তা একটি দপ্তর থেকে বিতরণ, সঠিক তালিকা প্রণয়ন, বরাদ্দ আত্মসাত রোধ, বিতরণে অনিয়ম দূর করে যথাযথভাবে খাদ্য সহায়তা প্রদান করা গেলে খাদ্য সহায়তা পাওয়ার যোগ্য ব্যক্তিরা পর্যাপ্ত খাদ্য সহায়তা পাবে। এর ফলে একদিকে যেমন তাদের খাদ্য অভাব দূর করা যাবে, পাশাপাশি তাদের ঘরে রাখার মাধ্যমে সামাজিক দূরত্ব বজায় থাকবে এবং করোনা ভাইরাসের বিস্তারও রোধ করা সম্ভব।

করোনা ভাইরাসের প্রভাব একদিন হয়তঃ শেষ হয়ে যাবে। মানুষ আবারও ফিরবে স্বাভাবিক জীবন। তবে সেটা কবে শেষ হবে সেটা জানেন না কেউ। আর করোনা ভাইরাস শেষ হলেও মানুষের প্রাণহানীর যে শোক তা ভোলা সম্ভব নয়। পাশাপাশি করোনা ভাইরাসের কারণে মানুষের যে অর্থনৈতিক ক্ষতি হচ্ছে তার ফলে হয়তঃ মানুষ ভবিষ্যতে পড়তে যাচ্ছে নতুন দুর্যোগ খাদ্য সংকটে। সারা পৃথিবীতে খাদ্যের অভাবে মৃত্যু ঘটতে পারে লাখ লাখ মানুষের বলে জানিয়েছে আন্তর্জাতিক অনেক সংস্থাও। এর প্রভাবও পড়তে পারে বাংলাদেশে।

তাই এই দুর্যোগকালীন ও পরবর্তী সময়ে সরকারি ও বেসরকারি বরাদ্দের সঠিক ব্যবহার ও সকল প্রকার অনিয়ম, দুর্নীতি ও স্বজনপ্রীতি দূর করে প্রকৃতপক্ষে খাদ্য সংকটে থাকা মানুষের পাশে দাঁড়ানোর মাধ্যমে তাদের ক্ষুধা দূর ও অর্থনৈতিক চাকাকে শক্তিশালী করে আগামীতে বাংলাদেশের অর্থনীতিকে একটি মজবুত ভিত্তিতে দাঁড় করানোর মাধ্যমে বাংলাদেশকে একটি শক্তিশালী রাষ্ট্রে পরিণত করা সম্ভব। পাশাপাশি দেশের সকল মানুষ যার যার নিজ অবস্থান থেকে ক্ষুধার্ত মানুষকে সহযোগিতা প্রদান ও পরবর্তীতে সময়ে সকলে একযোগে কাজ করে দেশকে এগিয়ে নেওয়ার জন্য এখনই প্রয়োজন দৃঢ় শপথ ।

লেখক: প্রকাশক, বাংলারশিক্ষা.কম ও জেলা প্রতিনিধি, চ্যানেল আই