CORONA

রাহাত হোসাইন, বাংলারশিক্ষা:
করোনা ভাইরাসের কারণে ঘরে না থাকলে আগামীতে নেমে আসতে পারে ভয়াবহতা। ঘর থেকে বের হওয়ার কারণে সামনে হয়তঃ আমাদের জন্য অপেক্ষা করছে ভয়ংকর পরিস্থিতি। আমাদের এই অসাবধনতা আর ভুলের কারণে বাংলাদেশে নেমে আসতে পারে মহামারী। আমরা করোনা পরিস্থিতিকে যত হালকাভাবে নিবো ততই মারাত্মক অবস্থা ধারণ করে ফিরে আসবে আমাদের কাছে। আমরা আমাদের দেশের সার্বিক পরিস্থিতিতে দৈনিক তিন/চার শতাধিক লোককে আক্রান্ত এবং কয়েকজন মানুষের মৃত্যু খুবই স্বাভাবিক ভাবে মনে করছি। কিন্তু তা মোটেই স্বাভাবিক না।

আবার আমরা যারা মাদারীপুর জেলায় বসবাস করছি তারা হয়তঃ মনে করছি কয়েক দিনের মধ্যে কোন নতুন রোগী শনাক্ত নাই, আমরা হয়তঃ করোনার প্রভাব থেকে মুক্তি পেতে যাচ্ছি। আমাদের এই ধারণা কারণে আমরা কিন্তু খুবই ভুল এবং মারাত্মক পরিস্থিতি সৃষ্টি করতে যাচ্ছি।

এমতাবস্থায় এখনই করোনা পরিস্থিতি নিয়ে কোন স্বস্তি প্রকাশ বা করোনা ভাইরাস চলে গেছে এমনটাই ভাবা হচ্ছে পৃথিবীর সবচেয়ে বড় বোকামি আর ভুল সিদ্ধান্ত। আর এই বোকামি ও ভুলের কারণে প্রাণহানী হতে পারে হাজার হাজার মানুষের।

ঘর থাকি, সুস্থ থাকি এর যদি আমার একটা উদাহরণ দেই। তার সর্বোচ্চকৃষ্ট উদাহরণ এই মুহুর্তে আমরা বলতে পারি শিবচর উপজেলাকে। বাংলাদেশের প্রথম করোনা ভাইরাস শনাক্ত জেলা হচ্ছে মাদারীপুর। আর শিবচর উপজেলা হচ্ছে প্রথম লকডাউন ঘোষণা করা উপজেলা। শিবচর উপজেলাকে শুধু লকডাউন ঘোষণা নয়, সেখানে তার যথাযথ কার্যকরও ছিল। পাশাপাশি মানুষও ছিল প্রথম পর্যায়ে ব্যাপক সচেতন। কারণ করোনার ভীতি তখন তাদের ঘিরে রেখেছিল। তবে দিন যত যাচ্ছে তাদের সেই ভীতি কমে যাচ্ছে এবং মানুষের মধ্যে ঘর থেকে বের হওয়ার প্রবণতা বৃদ্ধি পাচ্ছে। বিশেষ করে বাজারগুলোতে যেভাবে মানুষের ভীড় বাড়ছে তা এই মুহুর্তে সবচেয়ে বেশি উদ্বেগের কারণ।

প্রথম পর্যায়ে দেশের সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ উপজেলা ছিল শিবচর উপজেলা। প্রথমদিকে দেশের করোনা ভাইরাস শনাক্তদের মধ্যে সবচেয়ে বেশি ছিল শিবচর উপজেলায়। প্রথমেই শিবচর উপজেলায় ৯ জন করোনা ভাইরাসে শনাক্ত হন। এক প্রবাসীর মাধ্যমে সংক্রমিত হয় শিবচর উপজেলা। শিবচর উপজেলায় হঠাৎ করে এতো করোনা ভাইরাসে আক্রান্ত ব্যক্তি শনাক্ত হওয়ার পর তৎপর হয় স্বাস্থ্য বিভাগ, প্রশাসন, আইন-শৃঙ্খলা বাহিনী। প্রথমদিকে শিবচর উপজেলাকে অঘোষিতভাবে লকডাউন ঘোষণা করা হয়। এরপর শিবচরের ৪টি এলাকা আনুষ্ঠানিকভাবে লকডাউন ঘোষণা ও পরবর্তীতে ১৯ মার্চ থেকে পুরোপুরি অবরুদ্ধ করে শিবচরকে লকডাউন ঘোষণা করে প্রশাসন।

প্রথমদিকে ৯ জন রোগী শনাক্ত হওয়ার সাথে সাথে অঘোষিত লকডাউনের ফলে করোনা ভাইরাস সংক্রমন বিস্তার কিছুটা কমে আসে। এরপর দুইজন রোগী শনাক্ত হয়। পরে ৪টি এলাকা লকডাউন ঘোষণা করা তা আরো নিয়ন্ত্রিত হয়। কিন্তু পুরোপুরি লকডাউন না করায় ঝুঁকি থেকেই যায় শিবচর উপজেলায়। এই ঝুঁকি রোধ করতে শিবচর উপজেলাকে লকডাউন ঘোষণা করা হয়। লকডাউন ঘোষণার পরবর্তীতে শিবচর উপজেলায় আরও ৭ জন রোগী শনাক্ত হয়। কিন্তু এই ৭ জন রোগীর মধ্যে তিনজন এসেছেন নারায়নগঞ্জ ও ঢাকা জেলা থেকে এবং বাকি ৪ জন ব্যক্তি দ্বিতীয়বারের মতো শনাক্ত হন।

শিবচর উপজেলাকে অঘোষিত লকডাউন ঘোষণা পর সচেতন হয়ে উঠে স্থানীয়রা। স্বাস্থ্য বিভাগের অক্লান্ত পরিশ্রম, প্রশাসনের কঠোর অবস্থান ও স্থানীয়দের সচেতনতা কারণে করোনা পরিস্থিতির উন্নতি ঘটে শিবচর উপজেলায়। পাশাপাশি করোনা পরিস্থিতি মোকাবেলার জন্য অগ্রণী ভূমিকা পালন করেন মাদারীপুর-১ (শিবচর) আসনের সংসদ সদস্য ও চীফ হুইপ নূর-ই-আলম লিটন চৌধুরী। শিবচরে অবস্থান করে তিনি সার্বক্ষণিক করোনা পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ ও নির্দেশনা প্রদান করেন।

কিন্তু সাম্প্রতিক সময়ে শিবচরবাসীর মধ্যেও করোনা ভাইরাস তারা মোকাবেলা করে ফেলেছেন কিংবা করোনা পরিস্থিতির ব্যাপক উন্নতি হয়েছে অথবা ঘরে বসে থেকে থেকে বিরক্ত হয়ে যাওয়াসহ বিভিন্ন কারণে যেন বের হয়ে আসতে চাচ্ছেন ঘর থেকে। বিশেষ করে যখন বাজারগুলো সীমিত সময়ের জন্য খুলে দেওয়া হয়, সেই সময় ব্যাপক হারে মানুষ ঘর থেকে বের হয়ে আসছেন এবং প্রয়োজন-অপ্রয়োজনে বাজারে ভীড় করেন। যার কারণে আবারও ভয়াবহরূপ ধারণ করতে পারে করোনা ভাইরাস। এমনকি সেটা মহামারীরূপও নিতে পারে। তাই শিবচরবাসী ঘরে থেকে যে সাময়িক সুফল পেয়েছেন, তার থেকে আরও বেশি মাত্রায় ডেকে নিয়ে আসছেন ঝুঁকি। তাদের এই অসাবধনতা ও অসচেতনতাই ধ্বংস করে দিতে পারে হাজার হাজার মানুষের প্রাণ।

এবার আসি মাদারীপুর জেলা বাকি তিনটি উপজেলার মানুষের কথায়। এ রিপোর্ট লেখা পর্যন্ত মাদারীপুর সদর উপজেলায় করোনা ভাইরাস শনাক্ত হয়েছেন ৫ জন, রাজৈর উপজেলায় ২ জন এবং কালকিনি উপজেলায় ১ জন। এর মধ্যে সদর উপজেলার ৪টি এলাকার ৫ জন, কালকিনিতে নারায়নগঞ্জ থেকে আসা ১ ব্যক্তি এবং রাজৈর উপজেলার একই পরিবারের দুইজন।

এসব উপজেলার মানুষরা এই পরিসংখ্যান দেখে হয়তঃ ভাবছেন করোনা ভাইরাস আমাদের জন্য খুব একটি দুশ্চিন্তার বিষয় নয়। যারা এটা ভাবছি তারা হয়ত নিজের, নিজের পরিবার, নিজের এলাকার বা নিজ দেশের মানুষের মঙ্গল কামনা করেন না বা জীবনকে ভালোবাসেন না।

গত ৩ এপ্রিল থেকে এই রিপোর্ট লেখা পর্যন্ত মাদারীপুরে চারটি উপজেলায় করোনা ভাইরাস পরীক্ষার জন্য নমুনার তথ্য প্রদান করেছেন উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তাগণ।

কালকিনি উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডা. আল-বিধান মোহাম্মদ সানাউল্লাহ জানান, মোট ৪৭ টি নমুনা পরীক্ষা জন্য প্রেরণ করা হয়েছে এর মধ্যে ৪১টি রিপোর্ট পাওয়া গেছে, যার মধ্যে করোনা ভাইরাস শনাক্ত হয়েছেন ১ জন।

রাজৈর উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডা. প্রদীপ কুমার মন্ডল জানান, মোট ৯৩ টি নমুনা পরীক্ষা জন্য প্রেরণ করা হয়েছে এর মধ্যে ৭০টি রিপোর্ট পাওয়া গেছে, যার মধ্যে করোনা ভাইরাস শনাক্ত হয়েছেন ২ জন।

আর সদর উপজেলায় এ পর্যন্ত করোনা ভাইরাসে শনাক্ত হয়েছেন ৫ জন।

শিবচর উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডা. শশাঙ্ক চন্দ্র ঘোষ জানান, মোট ৯২ টি নমুনা পরীক্ষা জন্য প্রেরণ করা হয়েছে, যার মধ্যে করোনা ভাইরাস শনাক্ত হয়েছেন ১৭ জন।

তবে শিবচর উপজেলায় ৩ এপ্রিলের পূর্বে আইইডিসিআর এর দল সেখান থেকে নমুনা সংগ্রহ করেছিলেন। তাই আইইডিসিআর এর নমুনা পরীক্ষার সংখ্যা জানা যায়নি। তবে সেটাও যে খুব বেশি হবে না তা ধারণা করা যায়। কারণ প্রথম পর্যায়ে সারা দেশেই করোনা ভাইরাসের নমুনা পরীক্ষা খুবই সংক্ষিপ্ত আকারে করা হতো।

মাদারীপুর জেলায় এ রিপোর্ট লেখা পর্যন্ত মোট ২৮৯টি নমুনা পরীক্ষার জন্য প্রেরণ করা হয় এর মধ্যে ২২১ জনের রিপোর্ট পাওয়া গেছে। এই ২২১ জনের রিপোর্টে মোট ১৯ জন করোনা ভাইরাস পজিটিভ হয়েছেন।

এই রিপোর্টের ভিত্তিতে দেখা যায়, মোট নমুনা পরীক্ষার রিপোর্টে শনাক্ত হওয়ার শতকরা হার প্রায় ৯ শতাংশ। অর্থাৎ ১০০ জনের মধ্যে আক্রান্ত ৯ জন।

সর্বশেষ ২০১১ সালে দেশে আদমশুমারী হয়েছিল। সে অনুযায়ী মাদারীপুর জেলার পরিসংখ্যান অফিসের উপ-পরিচালকের দেওয়া তথ্য মতে, মাদারীপুর জেলায় মোট জনসংখ্যা ১২ লাখ ১২ হাজার ১৯৮ জন। এর মধ্যে সদর উপজেলায় ৩৫৯৮১২ জন, কালকিনি উপজেলায় ২৮৪২৪৫ জন, রাজৈর উপজেলায় ২৩৭৪৫৮ জন এবং শিবচর উপজেলায় ৩৩০৬৮৩ জন। কিন্তু দীর্ঘ ৯ বছরে মধ্যে নতুন কোন আদমশুমারী না হওয়ার কারণে মাদারীপুর জেলার বর্তমান জনসংখ্যার তথ্য পাওয়া যায় নাই।

এবার আমরা যদি ২০১১ সালের আদমশুমারী অনুযায়ী জনসংখ্যার হিসেবে বর্তমান করোনা ভাইরাসে শনাক্ত হওয়া শতকরা হার বের করি। তাহলে দেখা যায়, বর্তমানে মাদারীপুর জেলায় করোনা ভাইরাস শনাক্তের হার ৯ শতাংশ। সে হিসেবে সদর উপজেলায় জনসংখ্যা অনুযায়ী শনাক্তের সংখ্যা হয় ৩২৩৮৩ জন। কালকিনি উপজেলায় শনাক্তের সংখ্যা হয় ২৫৫৮২ জন। রাজৈর উপজেলায় শনাক্তের সংখ্যা হয় ২১৩৭১ জন এবং শিবচর উপজেলায় শনাক্তের সংখ্যা হয় ২৯৭৬১ জন।

তাহলে মোট জেলা শনাক্তের সংখ্যা দাঁড়ায় ১ লাখ ৯ হাজার ৯৭ জন। এতো ২০১১ সালের আদমশুমারী অনুযায়ী হিসাব। কিন্তু বর্তমানে দীর্ঘ ৯ বছরে মাদারীপুর জনসংখ্যা আরো অনেক বৃদ্ধি পেয়েছে। সেই হিসাব করলে মাদারীপুর জেলায় বর্তমান শতকরা হিসেবে সংখ্যা আরও অনেক বেশি হবে।

এবার যারা ভাবছেন করোনা ভাইরাস মাদারীপুরের জন্য কোন হুমকি নয়, কোন চিন্তার কারণ নেই, তারা উপরের পরিসংখ্যানটি দেখে বলুন চিন্তার কারণ আছে কিনা?
এখনও সারা পৃথিবীতে কোভিড-১৯ ভাইরাসের কোন প্রকার ঔষধ, প্রতিষেধক বা টিকা আবিস্কার হয় নাই। করোনা ভাইরাস থেকে বাঁচার একমাত্র পথ হচ্ছে সামাজিক দূরত্ব বজায় রাখা। নিজের ঘরে অবস্থান করা। তাই করোনা ভাইরাসের এই পরিস্থিতিতে অবহেলা না করে, তুচ্ছ না ভেবে গুরুত্ব সহকারে নিজ ও নিজের পরিবার, সমাজ ও রাষ্ট্রের মানুষের জীবনের নিরাপত্তার কথা চিন্তা করে ঘরেই অবস্থান করি। যতই কষ্ট হোক ঘরে থাকি, সুস্থ থাকি। আর এর মাধ্যমে করোনা ভাইরাস যে বৈশ্বিক মহামারী আকার ধারণ করেছে, সেই বৈশ্বিক মহামারী থেকে বাংলাদেশকে রক্ষা করি।

সব অজুহাত বাদ দিয়ে আজকেই আমরা শপথ গ্রহণ করি “ঘরে থাকি, নিরাপদ থাকি, বাংলাদেশকে রক্ষা করি”।
লেখক: প্রকাশক, বাংলারশিক্ষা.কম ও মাদারীপুর প্রতিনিধি, চ্যানেল আই।