AKON_Picture

মোহাম্মদ জাহিদ আকন:
১৯৯০ সালে সত্যজিৎ রায়ের ‘গণশত্রু’ সিনেমা মনে হয় অনেকে দেখেছেন। যদি না দেখে থাকেন তাহলে সুযোগ পেলে দেখে নিবেন।

সিনেমাটিতে ডা. অশোক গুপ্ত নামে একটি চরিত্র বিদ্যমান। শুরুতে ডা. অশোক গুপ্ত জনবার্তা নামে একটি পত্রিকার সম্পাদককে ফোন করে জানান যে, পানিবাহিত রোগে আক্রান্ত রোগী হাসপাতাল ও তার ব্যক্তিগত চেম্বারে ক্রমেই বৃদ্ধি পাইতেছে। এই বিষয় একটি সচেতনামূলক খবর প্রকাশ করার জন্য অনুরোধ করেন। যা প্রকাশ করে এবং আরো তথ্যাদি সংগ্রহের জন্য প্রতিনিয়িত পত্রিকার সম্পাদক ডা. অশোক গুপ্ত সাথে যোগাযোগ চলমান রাখে।

ডাক্তার বলে কথা। তিনি থেমে থাকেন নাই। তিনি এর মূল কারণ উপস্থাপনের জন্য প্রতিনিয়িত চেষ্টা করেন। একজন আদর্শ ডাক্তারের ধর্মই মানব সেবা।

পর্যায়ক্রমে অনেক যাচাইবাছাই পূর্বক ডা. অশোক গুপ্ত নিশ্চিত হন যে, ঐ গ্রামের একটি মন্দিরের পানি পানের মাধ্যমে এই রোগে সাধারণ মানুষ আক্রান্ত হইতেছে। ডা. অশোক গুপ্ত ঐ গ্রামের মানুষের মঙ্গলের জন্য একটি প্রতিবেদন তৈরি করেন যে, মন্দিরটি সাময়িকভাবে বন্ধ করে পানির পাইপ পরিবর্তনসহ পানি নিষ্কাশন করার জন্য।

কিন্তু সমাজের এক শ্রেনীর মানুষ বা জনপ্রতিনিধি আছে। তাহাদের মূল পুঁজি বা ব্যবসাই হলো ঐ মন্দির ঘিরে। তাহারা চিন্তা করেন এই মন্দির নিয়েই তাহাদের নির্বাচনের ভোট, রাজনীতি, আর্থিক লাভ ইত্যাদি ইত্যাদি।

সে মর্মে তাহারা বিভিন্নভাবে সাধারণ মানুষকে ভুলভাল বোঝায়, এমনকি ধর্মীয় সাম্প্রদায়িকতার কথা বলেন বিভ্রান্ত ছাড়ায়। যাহার ফলস্বরূপ ডা. অশোক গুপ্ত সাধারণ মানুষের কাছে শত্রু হিসেবে পরিচিত লাভ করে লাঞ্ছিত হন।

বর্তমানে করোনা ভাইরাসে বাংলাদেশসহ সারা বিশ্বে এক মহামারী দেখা দিছে। এখন পর্যন্ত প্রায় পৌনে দুই লক্ষের বেশি মানুষ প্রাণ হারিয়েছে এই ভাইরাসে। বিশ্বের সকল ক্ষমতাধর দেশ যেখানে প্রতিনিয়ত সংগ্রাম করে চলছে এই মহামারীর বিরুদ্ধে, কিন্তু কোন সফলতার মুখ দেখতে পাইতেছে না। ঠিক এই সময় আমরা আমাদের দেশের মানুষ কতটুকু প্রচেষ্টা করতেছি।

বিষয় হলো সত্যজিৎ রায়ের গণশত্রু সিনেমার মত আমাদের সমাজের কিছু ব্যক্তিবর্গ চিন্তা করিতেছে যে, চাউল, ডাল, তৈল ইত্যাদি চুরিসহ যাবতীয় অপকর্ম নিয়ে। আসলে আমরা কি করিতেছি বা কেন? একবার চিন্তা করি। বিষয়টি সত্যিই দুঃখজনক।

করোনা ভাইরাস বাংলাদেশে সর্বপ্রথম মাদারীপুর জেলাধীন শিবচর উপজেলা শনাক্ত হওয়ার পর, শিবচর উপজেলা লকডাউন করা হয়। পর্যায়ক্রমে এখন অনেক জেলাসহ, উপজেলা, বিভিন্ন স্থান লকডাউন করা হয়েছে। সামাজিক যোগাযোগের মাধ্যমে বিভিন্ন তথ্যাদি প্রচার করা হইতেছে। যখন সামাজিক যোগাযোগে চিকিৎসা সামগ্রী সংকট বলে প্রচারণা হয়, ঠিক তখনই সরকার প্রত্যেক হাসপাতালে চিকিৎসা প্রদানে প্রয়োজনীয় সামগ্রী বিতরণ করেন।

গত কয়েকদিন আগে যমুনা টিভি একটি নিউজ প্রচার করেন যে, সরকার প্রত্যেক হাসপাতালে প্রয়োজনীয় চিকিৎসা সামগ্রী সরবরাহ করে। উক্ত চিকিৎসা সামগ্রী মধ্যে এন৯৫ মাস্ক প্রতিটি হাসপাতালে পর্যাপ্ত বিতরণ করা হয়েছে।

প্রথমে জানা দরকার এন৯৫ মাস্ক কি? এন৯৫ মাস্ক হলো ঐ সকল মাস্ক যা করোনা রোগীকে সরাসরি সেবা প্রদানের সময় ডাক্তার নিজের নিরাপত্তার জন্য ব্যবহার করেন। ইহা ছাড়া সরাসরি করোনা ভাইরাসের আক্রান্তের রোগীর চিকিৎসা করা অসম্ভব।

কিন্তু দুঃখের বিষয় হলো উক্ত এন৯৫ মাস্কটি প্যাকেটের উপর ঠিকই লেখা আছে, কিন্তু ভিতরের আসলে এন৯৫ মাস্ক না বরং ইহা একটি সাধারণ কাপুরের মাস্ক। এই মর্মে মুগদা জেনারেল হাসপতাল এর পরিচালক ডাঃ শহিদ মোঃ সাহিদুল ইসলাম গত ০১/০৪/২০২০ইং তারিখের স্মারক ৮৬৮ মূলে পরিচালক, আইইডিসিআর, মহাখালী, ঢাকা-১২১২ কাছে “এন৯৫ মাস্ক সম্পর্কে মতামত প্রদান প্রসঙ্গে” একটি পত্র প্রেরণ করেন। উক্ত পত্রের বিষয়টি সকল মহলে জানাজানি হওয়ার পরই সবার সাধারণ ঘুম ভেঙ্গে যায়।

পরবর্তীতে সরকারি হাসপাতলের চিকিৎসা সামগ্রী বিতরণকারী প্রতিষ্ঠান সিএমএসডি এই সকল নকল মাস্ক প্রত্যাহারের কথা বলে। বিষয়টি সত্যিই দুঃখজনক। এই বিষয় সিএমএসডি-এর পরিচালক জনাব ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মো. শহীদুল্লাহ বলেন যে, পুরা বিষয়টি ভুলঃবশত। প্রশ্ন হলো কি ভুল? কার ভুল? কেন ভুল? ইত্যাদি ইত্যাদি?

কিছুদিন পূর্বে করোনা ভাইসারের মৃত্যু মিছিলে যুক্ত হলেন সিলেট ওসমানী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের একজন সুপরিচিত (গরিবের ডাক্তার নামে খ্যাত) অধ্যাপক ডা. মঈন উদ্দিন। ডা. মঈন উদ্দিন কি অন্যকোন দেশ থেকে ভাইরাসে আক্রান্ত হয়েছেন বা তিনি অসচেতন একজন নাগরিক। অনেক প্রশ্ন। উত্তর হলো, তিনি একজন ডাক্তার হিসেবে করোনা ভাইরাসের আক্রান্ত রোগীর সেবা প্রদানের জন্য প্রয়োজনীয় সামগ্রী পান নাই। তিনি পারতেন নিজের কথা বা পরিবারের কথা চিন্তা করে দায়িত্ব এড়িয়ে যেতে। কিন্তু তিনি করেন নাই। তিনি আসলের প্রকৃত বীরযোদ্ধা। ফলস্বরুপ তার সন্তান হারালো পিতাকে, তার স্ত্রীর হারালো স্বামীকে।

১৮ই এপ্রিল শিবচর স্বাস্থ্য বিভাগ নিশ্চিত করলেন যে, মাদারীপুর জেলাধীন শিবচর উপজেলায় চিকিৎসক ও তার সন্তান করোনা ভাইরাসে আক্রান্ত। এভাবে চলতে থাকলে মানুষের সেবার জন্য ক্রমেই চিকিৎসক পাওয়া যাবে না।

সবকিছু বাদ দিয়ে আগে চিকিৎসকের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা একান্ত প্রয়োজন। আমাদের মাননীয় প্রধানমন্ত্রী করোনা ভাইরাস এর বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করেন। সবার মনে রাখতে হবে এই যুদ্ধের প্রধান যোদ্ধাই হলো চিকিৎসকসহ সকল স্বাস্থ্যকর্মী। আর আমরা যদি যোদ্ধেদের অস্ত্রছাড়া যুদ্ধে পাঠানো আর প্যারাসুট ছাড়া আকাশ থেকে লাফ দেওয়া একই কথা। দুইটাই বোকামি ছাড়া কিছু না।

আশা করি স্বাস্থ্য বিভাগ চিকিৎসকসহ স্বাস্থ্যকর্মীর সকল সুযোগ সুবিধা নিশ্চিত করার দ্রুত ব্যবস্থা গ্রহন করবেন।তা না হলো ক্রমে প্রাণ হারাবে আমাদের বীরযোদ্ধারা। তখন প্রশ্ন সকলের করবে যে, এই লজ্জা কার? হয়তো এখনও অনেকে মনে করতেছে যে, উক্ত নকল এন৯৫ মাস্কই বেশিরভাগ ডাক্তার আক্রান্ত হওয়ার প্রত্যক্ষ কারণ। যাইহোক এখনই সময় আমাদের মানবতাকে জাগ্রত করার। আমাদের মানবতা জাগ্রত না হলো সত্যিই এইভাবে একে একে ধ্বংস হবে জাতি দেশ।
ই-মেইল: akon.jahid19@gmail.com

বি:দ্র: মতামত বিভাগের সমস্ত লেখা লেখকের নিজস্ব মতামত। এ বিভাগের কোন দায়-দায়িত্ব সংশ্লিষ্ট বাংলারশিক্ষার কর্তৃপক্ষের না।