রাহাত হোসাইন:
সারাবিশ্বের আতংকের নাম করোনা ভাইরাস। সারা পৃথিবীতে ছড়িয়ে পড়েছে ভাইরাসের প্রাদুর্ভাব। মহামারী দেখা দিয়েছে বিশ্বজুড়ে। কোনভাবেই যেন থামানো যাচ্ছে না করোনার প্রভাব। পৃথিবী জুড়ে স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ, চিকিৎসা বিজ্ঞান যেন মুখ থুপড়ে পড়ছে। করোনা ভাইরাস থেকে রক্ষার কোন কার্যকর ঔষধ আবিস্কার করতে পারছেন না তারা। লকডাউন, সামাজিক দূরত্ব আর ঘরে থাকাই যেন শেষ ভরসা। আর সেগুলোও যথাযথভাবে প্রয়োগ করা যাচ্ছে না।

সারা পৃথিবীর মতো বাংলাদেশেও আক্রান্ত হয়েছে করোনা ভাইরাসে। আর বাংলাদেশের মধ্যে প্রথম ঝুঁকিপূর্ণ জেলা হচ্ছে মাদারীপুর। বাংলাদেশে প্রথম লকডাউন শব্দটা প্রয়োগ করা হয় মাদারীপুর জেলার শিবচর উপজেলায়।

আস্তে আস্তে বিস্তার লাভ করতে থাকে করোনা ভাইরাস। আর পরিধি বাড়তে থাকে লকডাউনের এলাকা। এখন বাংলাদেশের ৬৪ জেলাই করোনা ভাইরাসে সংক্রমিত।

প্রথম পর্যায় যেখানে মাদারীপুর জেলা ছিল দেশের অন্যান্য জেলার কাছে আতংক। আর এখন মাদারীপুর জেলাই আতংকিত হচ্ছে অন্যান্য জেলার কারণে। কারণ মাদারীপুর থেকে অনেক জেলাই এখন করোনা শনাক্ত রোগীর সংখ্যা বেশি।

আমরা যদি গত কয়েকদিনে মাদারীপুর জেলায় করোনা রোগী শনাক্তের তথ্য দেখি, সেখানে দেখা যাবে প্রায় সকল রোগীই অন্য জেলা থেকে মাদারীপুরে এসেছেন। বিশেষ করে ঢাকা, নারায়নগঞ্জ ও মুন্সীগঞ্জ জেলা থেকে।

মাদারীপুর জেলায় করোনা রোগীর আক্রান্ত শনাক্তের যে ধীর গতি ছিল তা হয়তঃ রক্ষা করা এখন অনেকটাই কঠিন বিষয়। মাদারীপুর জেলার করোনা ঝুঁকির নতুন নাম হচ্ছে কাঁঠালবাড়ি নৌরুট।

কাঁঠালবাড়ি নৌরুটটি মাদারীপুর-শরীয়তপুর-মুন্সীগঞ্জ জেলা নিয়ে আবর্তিত। কাঁঠালবাড়ি মাদারীপুরে, মাঝিরঘাট শরীয়তপুরে এবং শিমুলিয়া মুন্সীগঞ্জ জেলায় অবস্থিত। আর কাঁঠালবাড়ি নৌরুট হচ্ছে দক্ষিণবঙ্গের সাথে ২১ জেলার মানুষের যাতায়াতের প্রবেশদ্বার। তাই এই ঘাটটি যেমন গুরুত্বপূর্ণ, তেমনি জনবহুল, যার ফলে করোনার ঝুঁকিও প্রচুর।

করোনা রোগী শনাক্ত হওয়ার পর যখন প্রথম পর্যায় সরকার সাধারণ ছুটি ঘোষণা করলো তখন আমরা দেখলাম কাঁঠালবাড়ি ঘাটে জনসমুদ্র। তেমনিভাবে সর্বশেষ গার্মেন্টস খোলার ঘোষণার দেওয়ার সাথে সাথে মাদারীপুর জেলার কাঁঠালবাড়ি ঘাট হয়ে ঢাকা, নারায়নগঞ্জসহ অন্যান্য জেলায় যাওয়ার জন্য জনসমুদ্রের মতো মানুষ ছুটছে।
মাদারীপুর জেলার সাথে সীমান্তবর্তী জেলাগুলো হচ্ছে বরিশাল, গোপালগঞ্জ, ফরিদপুর, শরীয়তপুর ও মুন্সীগঞ্জ। বিশেষ করে এই মুহুর্তে সবচেয়ে বেশি যোগাযোগ রয়েছে মুন্সীগঞ্জ ও শরীয়তপুর জেলার সাথে। কারণ কাঁঠালবাড়ি-শিমুলিয়া নৌরুটটি মাদারীপুর-মুন্সীগঞ্জ-শরীয়তপুর নিয়ে।

মুন্সীগঞ্জ স্বাস্থ্য বিভাগের তথ্য মতে, জেলায় করোনা রোগী শনাক্তের সংখ্যা ২১১ জন আর আইইডিসিআর এর ৬ মে’র পরিসংখ্যান অনুযায়ী শরীয়তপুর জেলায় ৫৪ জন। মাদারীপুর স্বাস্থ্য বিভাগের তথ্য মতে, মাদারীপুরে করোনা রোগী শনাক্তের সংখ্যা ৪১ জন।

মাদারীপুর জেলায় করোনা রোগী শনাক্ত হওয়ার অনেকদিন পর করোনা রোগী শনাক্ত হয় মুন্সীগঞ্জ ও শরীয়তপুর জেলায়। কিন্তু বর্তমানে দুটি জেলায় এখন করোনা রোগীর সংখ্যা মাদারীপুর জেলা থেকে বেশি।

প্রতিদিন জেলার কাঁঠালবাড়ি ঘাট থেকে ফেরি, লঞ্চ, স্পীডবোডসহ অন্যান্য নৌযান শরীয়তপুর জেলা হয়ে মুন্সীগঞ্জ জেলায় যাতায়াত করে এবং মানুষ মুন্সীগঞ্জ হয়ে ঢাকা ও মাদারীপুরে প্রবেশ করেন। এর ফলে শরীয়তপুর ও মুন্সীগঞ্জের সাথে প্রতিনিয়ত যোগাযোগ হচ্ছে মাদারীপুর জেলার। বিশেষ করে এসব নৌযানের কর্মকর্তা, কর্মচারী, চালক ও যাত্রীরা সরাসরি সংস্পর্শ আসছে মুন্সীগঞ্জ ও শরীয়তপুর জেলার মানুষের সাথে এবং পরবর্তীতে এরাই মাদারীপুর জেলায় অবস্থানসহ জেলার মধ্যে প্রবেশ করছেন।

বর্তমান পরিস্থিতিতে মাদারীপুর জেলার আশে-পাশের জেলাগুলোর মধ্যে সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিপূর্ণ জেলা হচ্ছে মুন্সীগঞ্জ। গত কয়েকদিনেই সেখানে করোনা আক্রান্তের শনাক্তের সংখ্যা হু হু করে বাড়ছে। এ রিপোর্ট লেখা পর্যন্ত মুন্সীগঞ্জে করোনা রোগী শনাক্তের সংখ্যা ২১১ জন।

কাঁঠালবাড়ি নৌরুট দিয়ে প্রতিনিয়ত মানুষ যাতায়াত ও মুন্সীগঞ্জে জেলার মানুষের সংস্পর্শ নিয়ে মাদারীপুরে প্রবেশ করার ফলে মারাত্মক করোনা ঝুঁকিতে পুনরায় পড়তে যাচ্ছে মাদারীপুর জেলা। পাশাপাশি ঢাকা, নারায়নগঞ্জসহ বিভিন্ন জেলা থেকেও প্রতিনিয়ত মাদারীপুরে প্রবেশ করে মানুষ। যা মাদারীপুর জেলাকে করোনা পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলছে।

সমগ্র মাদারীপুর জেলাটি গত ১৯ মার্চ থেকে লকডাউন ঘোষণা করেছে প্রশাসন। কিন্তু লকডাউন থাকা সত্ত্বেও মাদারীপুর জেলায় অন্যান্য জেলা থেকে মানুষের প্রবেশ বন্ধ করতে পারছে না প্রশাসন। যার উদাহরণ বিগত কয়েকদিনে মাদারীপুর জেলায় করোনা শনাক্ত আক্রান্ত ব্যক্তিরা, যারা প্রায় সবাই জেলার বাহির থেকে এসে মাদারীপুরে করোনা শনাক্ত হয়েছেন। লকডাউন যথাযথ কার্যকর না হওয়ায় করোনার অধিক ঝুঁকিতে পড়তে যাচ্ছে মাদারীপুরবাসী।

এমতাবস্থায় লকডাউন কার্যকরে প্রশাসনের আরও কঠোর অবস্থান যাতে অন্য কোন জেলা থেকেই মাদারীপুর জেলায় প্রবেশ করতে না পারেন এবং কাঁঠালবাড়ি নৌরুটের যাতায়াতকারীদের মাদারীপুর জেলায় কোথাও অবস্থান করতে না দেওয়া বা কাঁঠালবাড়ি ঘাটে সামাজিক দূরত্ব বজায় রাখা ও আরো বেশি নিরাপত্তার ব্যবস্থা করে মাদারীপুর জেলাকে করোনার ঝুঁকি থেকে রক্ষা করার দাবি মাদারীপুরবাসীর।