banorসুরাইয়া পারভীন:

মাদারীপুর এই সেদিনের জেলা । মহাকুমা হিসেবেই পরিচিতি। তবে, মাদারীপুরের চরমুগুরিয়া অনেক পুরনো । কুমার নদ ঘিরে গড়ে উঠেছিল অনেক শিল্প আর ব্যবসা প্রতিষ্ঠান । এলাকায় পাট চাষ হতো প্রচুর । ছিল বড় ধরনের পাটের মোকাম । অনেক বড় বড় জুটমিল। এর একটা ‘এ আর হাওলাদার’ জুট্ মিল’ এখনও ভাঙা কোমর নিয়ে টিকে আছে । তবে কুমার নদ অববাহিকায় যেটা, সেটা সম্ভবত এখন আর নেই ।

এক সময় কুমার নদ বড় গভীর আর খরস্রোতা ছিল । জাহাজ চলাচল করতো ব্যবসায়িক পণ্য নিয়ে । বৃটিশ বণিকদের যাতায়াত ছিল হেথায় । অনেকেই স্থায়ী আবাস গড়ে তুলেছিল । বৃটিশদের তৈরি বিভিন্ন স্থাপনা আর স্কুল আছে এখানে । মাদারীপুর আমি যে স্কুলে পড়েছি , সেটা এক বৃটিশ রমণীর নিজস্ব ফান্ডের নিজের প্রচেষ্টার । বিশাল এরিয়া- পুকুর , মা্‌ঠ, টিচার্স কোয়ার্টার সমেত সুন্দর ক্যাম্পাস ।

জসিম উদ্দীনের সোজন বাদিয়ার ঘাট কাব্যগ্রন্থে কুমার নদ এর অবস্থান আছে। কবিতার বর্ণনায় কুমার নদ এর চওড়ার বিশালত্ব পাওয়া যায় । অবশ্য এই কুমার নদ ফরিদপুর অঞ্চলেও বিস্তৃত। উলটো করে বললাম – নদ ফরিদপুর হয়েই মাদারীপুর । পদ্মা থেকে এসেছে ।

আমাদের বড় বোন অনেক দিন চরমুগুরিয়াতে ছিলেন । সেখানের একটা স্কুলে চাকরির সুবাধে। মাদারীপুরের একদম কাছে থাকা সত্ত্বে, এই চরমুগুরিয়াতে কখনো যাওয়া হয় নি। আপার বাসায় বেড়ানো উপলক্ষ্যে চরমুগুরিয়া যাওয়া , কুমার নদ কাছ থেকে দেখা আসেপাশের লোকজনের সাথে সেই নদ এ অবগাহন করা ।

মৃতপ্রায় খাল এর আকার ধরেছে এ নদ । তবে কোথায় কিভাবে যেন স্রোত ঠিকই উথলে আসে । এ নদ নিয়ে মিথ আছে । প্রতি বছর দু’একজন করে এতে মানুষ মারা যাবে । নদীতে ডুবে মানুষ মারা যাওয়া বৈচিত্রের কিছু না । হঠাৎ তেড়ে আসা স্রোতে টাল সামলাতে পারে না হয়তো । তবে খালের আকার ধারন করা এ নদ এ ডুবে যাওয়া মানুষকে হতবাক করে ।

চরমুগুরিয়াতে আপার বাসায় থাকাকালীন সময়ে আমি দু’জনের মৃত্যু দেখেছি। দাদা নাতি – গোসল করতে গিয়ে ডুবে গেছে । দুই পারে মহিলারা তাদের গৃহস্থালি কাজ নিয়ে বসে । থালাবাটী , কাপড় চোপর ধোয়া এই নদ এর পানিতেই । একদম ফাঁকা জনমানবহীন কম সময়েই থাকে । এর মাঝে কেউ একা পরে গেলে , সে নাকি হারিয়ে যায় ।

সেবারে দাদা নাতিকে প্রচুর খোঁজাখুঁজি করলো লোকজন । সাথে বাতাসে ভাসতে থাকলো মিথ । বাঁক এর মতো একটু যায়গা , সেখানটা কিছু চওড়া । দু’পাড়ের লোকজন সব , সাথে ফায়ার সার্ভিসের ডুবুরি । কোনভাবেই সন্ধান পায়নি সারাদিন । পরদিন লাশ আপনাআপনি ভেসে উঠেছে । দাদা নাতিকে জড়িয়ে ধরা অবস্থায় । শিক্ষিত আধুনিক জনের ভাষ্য — দাদা স্ট্রোক করেছে হয়তো , সাথে জড়িয়ে নাতিকেও ডুবিয়ে নিল ।

মিথ এর আলোচক যারা , তারা তাদের বিশ্বাসের যায়গাতেই ছিল । চিরুনি চালুনি দিয়েও আগের দিন পেল না । পাশে জেলে পারা, জাল দিয়ে পুরা নদ ছেঁকেছে । উৎসাহি জনতা কোন রকম কার্পণ্য করেনি নদ এর পানিতে তান্ডব চালাতে ।
নেই তো নেইই । পরদিন ঠিক সে যায়গাতেই আপনা ভেসে ওঠে ।

আসি বানরে

শোনা যায় কোন বৃটিশ বণিক শখ করে বানর নিয়ে এসেছিল চরমুগুরিয়াতে । সেগুলো এখন অগণিত সংখ্যায় বেড়ে উঠেছে । আমার ছোটবেলায় মাদারীপুর শহরেও বানর দেখেছি । লোকসংখ্যা বাড়তে থাকায় , গাছপালা ঘেরা বাড়ী কমতে থাকায় , হয়তো সেগুলো দূরে সরে গিয়েছে । দূরে আর কোথায় ? এখন ভাবি , সব চরমুগুরিয়াতে যায়গা নিয়েছে । ২০১৫ সালের এক নিউজে দেখা যায় পাঁচ শত বানরের আবাস চরমুগুরিয়াতে । এখন তা সাত আটশ ছাড়িয়েছে হয়তো , অথবা ধরে নেই পাঁচ শ তেই আটকে আছে । খাওয়া দাওয়া বাস স্থানের অভাব , কতো আর বাড়তে পারে !! উলটো কমার সম্ভাবনা ।

কে বা কারা কিছু বানর হত্যা করেছে বিষ দিয়ে । তাদের গাছের ফল খেয়ে ফেলছে । যারা করেছে কাজটি চরম নৃশংস , অমানবিক । অনেক দিনের ঐতিহ্য চরমুগুরিয়ার এই বানর । হাঁটে মাঠে বাজারে সর্বত্র এদের অবস্থান , যাতায়াত । অন্দরে, উঠানে, রান্নাঘরে – এদের অবাধ বিচরণ । গৃহিনীরা কোন রকম অমনোযোগী হতে পারে না । রান্না করা মাত্র খাবার মিটশেফে আটকে রাখে । গাছপাকা কলা খাবার ভাবনাও তারা করে না । রঙ ধরার আগে কেটে তালাবদ্ধ রাখে , রাখতে হয় ।

এতে যে খুব লাভ হয় , সেটা না । তারপরেও সেখানকার মানুষ অসম্ভব মনোযোগী থাকে, খাবার সংরক্ষণের ব্যাপারে । রিল্যাক্স মুডে পরিবারের সকলে উঠানে বসে আসর জমিয়ে খেতে বসেছে । দেখা গেল সামনে থেকে মুহুর্তে খাবার উধাও । ভাগ্নি আর ওর বান্ধবী স্কুলে টিফিন নিয়ে একটু সৌজন্য করে যাচ্ছিল । একজন আরেকজনকে সাধাসাধি করতেছে , আগে নেয়ার জন্য । দু’জনের টিফিন বক্স খোলা । হঠাৎ আবিস্কার করলো বক্সের টিফিন হাওয়া । বানরে নিয়ে গেছে । বান্ধবী দু’জন বেকুব হয়ে তাকিয়ে রইলো ।

সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়ের ‘পায়ের তলায় সর্ষে’ যারা পড়েছেন । এরকম একটা ঘটনার মুখোমুখি তারা হয়েছেন আন্দামান দীপপুঞ্জে ।

মনোহরী এই দ্বীপের কিছু অধিবাসীরা হরিণ এর জ্বালায় অতিষ্ঠ । আমাদের মতো যারা, তারা ভাবতেও পারি না । এতো সুন্দর একটা প্রাণী । আবার, যার গোশত অতি উপাদেয় । সে কি করে বিরক্তির কারণ হতে পারে !! সেখানে এতো মাত্রায় হরিণ , কৃষকের ফসল রাখা দায় । হরিণের গোশত অতি সস্তা , মানুষ খেতে চায় না । অতি সহজলভ্যতার জন্যই । খেতে খেতে অরুচী এসে গেছে।

লেখকের দেখা পেয়েছিল একটা অসহায় হরিণ । বাঁচার তীব্র আকুতি । পা দুটো বাঁধা , সমুদ্রের ঢেউ তেড়ে আসছে । লেখক সাহায্য করতে চেয়েছিলেন ও । কিন্তু এই বণ্য হরিণ তাকে বন্ধু ভাববে কি করে । বাঁধা অবস্থাতেই তার দিকে শিং বাঁকিয়ে দেয় । দঁড়ি টাইট করে বাঁধা , খোলা সহজ না । তার উপরে হরিণের বাঁচার চেষ্টায় হিংস্র আচরণ করতে থাকা। লেখক আর কুলিয়ে উঠতে পারে নি । হরিণ সমুদ্রের জোয়ারে ভেসে যায় ।

শোনা যায় , সেখানেও কেউ শখ করে দুটো হরিণ নিয়ে এসে বনে ছেড়ে দিয়েছিল । পরিবেশের ভারসাম্য , প্রকৃতি নিজে রক্ষা করে । মানুষ অতি দরদী হয়ে , অতি সৌন্দর্যপ্রিয় হয়ে যা কিছু করতে যায় । সেটা বড় ক্ষতিকর হয়ে ওঠে । শুধুমাত্র হরিণের জন্য মায়া না করে , কিছুটা মমতা বাঘের জন্য রাখতে হতো । বাঘের হাত থেকে বাঁচাতে ভিন্ন কোথাও ওর আবাস করছে । এখন ওরা নিজেরাই পরিবেশের আপদ হয়ে উঠছে ।

আন্দামানে তবু গাছপালা ভর্তি ঘন জঙ্গলঘেরা এলাকা । ঘাস লতাপাতা প্রচুর । তারপরেও কৃষকের কষ্টের ফসল যখন খেয়ে ফেলে । তার কাছ থেকে মানবতা আশা করা যায় না ।

চরমুগুরিয়ায় এতো দিন ধরে থাকা বানরগুলোর খোঁজ । ওদের খাবারদাবার বন্য প্রাণী সংরক্ষণ অধিদপ্তর দেখতেন কি ? কিন্তু , ইচ্ছেয় হোক অনিচ্ছায় হোক – এই বানরের খাবার দাবারের ভার স্থানীয়দেরই ছিল ।এটা বড় অনেক দিন ধরে বড় ধরনের জুলুম হয়ে আসে। স্থানীয়রা বানরদের সাথে সহাবস্থান করেই ছিল । করোনা’র প্রভাব কি না কি জানি । কেউ হয়তো অসহিষ্ণু হয়ে উঠেছে ।

বানর গুলোকে হত্যা করা অমানবিক । কিন্তু বানরদের দেখভাল করার ভার, এতোদিন ধরে ‘বন্য প্রাণী সংস্থার’ না নেয়াটা সেটা আরও বড় ধরনের অপরাধ । প্রশাসনের সু-দৃষ্টি আসুক । চরমুগুরিয়ার ঐতিহ্যবাহী বানর ওদের আপনজন হয়েই টিকে থাকুক ।

লেখক: গৃহিনী। কালকিনি উপজেলার সাহেবরামপুর গ্রামের বাসিন্দা। ঢাকায় বসবাস।

বি:দ্র: এ লেখা লেখকের নিজস্ব মতামত। এর সাথে বাংলারশিক্ষা কর্তৃৃপক্ষ সংশিষ্ট নয়।