বাংলারশিক্ষা:
লিবিয়ায় মানব পাচারকারীদের আক্রমণে হতাহত বাংলাদেশিদের মধ্যে মাদারীপুরের নিখোঁজ, মৃত ও আহতের বাড়ীতে বইছে শোকের মাতম। পরিবার আত্মীয়-স্বজনের কান্নার আহজারীতে ভারী হয়ে উঠেছে এলাকার আকাশ-বাতাস। শান্তনা দেয়ার জন্য আশপাশের মানুষ আসলেও তারাও করুন কাহিনী শুনে কান্না ভেঙ্গে পড়ছে।

স্বপ্ন পূরণের আশায় স্থানীয় দালালদের আশ্বাসে বিদেশে পাড়ি জমিয়ে ছিল মাদারীপুরের বেশ কিছু যুবক। কিন্তু সেই আশার গুড়েবালি। তাদেরকে লিবিয়া অবস্থানরত দালালরা জিম্মি করে দফায় দফায় টাকা দাবি করেন। এক পর্যায়ে দালালদের দাবিকৃত টাকা না দিতে পারায় গুলি করে হত্যা করে বাংলাদেশের ২৬ জনকে।

লিবিয়ায় মানব পাচারকারীদের গুলিতে মাদারীপুর জেলায় ১১ জন নিহত ও ৩ জন আহতের কথা জানিয়েছেন জেলা প্রশাসক। এতে উদ্বিঘ্ন-উৎকণ্ঠায় রয়েছেন নিখোঁজ যুবকদের পরিবার। হতাহতের ঘটনায় এদের হদিসও পাচ্ছে না পরিবারগুলো। নিহত ও আহত পরিবারের দাবি, মৃতদেহ স্বজনদের কাছে ফিরিয়ে দেয়ার। আর দোষীদের শাস্তির দাবি করেছেন ভূক্তভোগি পরিবার। প্রশাসনও দালালদের শাস্তির আওতায় আনার চেষ্টা করছেন বলে জানিয়েছেন।

নিহতরা হলেন মাদারীপুর সদর উপজেলার জাকির হোসেন, শামীম, জুয়েল ও ফিরুজ, রাজৈর উপজেলার বিদ্যানন্দী গ্রামের রাজ্জাক হাওলাদারের ছেলে জুয়েল হাওলাদার (২২) একই গ্রামের শাহ আলম হাওলাদারের ছেলে মানিক হাওলাদার (২৮), টেকেরহাট এলাকার আসাদুল, আয়নাল মোল্লা ও মনির, ইশিবপুর ইউনিয়নের আড়াইপাড়ার আনজু বেপারীর ছেলে সজীব বেপারী (২৩) ও দক্ষিণ গোয়ালদী গ্রামের কালাম মাতুব্বরের ছেলে শাহীন মাতুব্বর (২৪)।

এ ঘটনায় আহত হয়েছেন মাদারীপুরের ৩ জন। এরা হলেন মাদারীপুর সদর উপজেলার তীর বাগদি গ্রামের ফিরোজ বেপারী (২৫), রাজৈর উপজেলার কদমবাড়ির মহিষমারী গ্রামের মোক্তার আলী শিকদারের ছেলে মোহাম্মদ আলী শিকদার (২২), ইশিবপুর ইউনিয়নের আড়াইপাড়া গ্রামের খলিল খালাসীর ছেলে মো. সম্রাট খালাসী (২৯)। আহতরা লিবিয়ার ত্রিপোলি মেডিকেল সেন্টারে চিকিৎসাধীন রয়েছে।

এছাড়া মাদারীপুরের কয়েকজন যুবক নিখোঁজ রয়েছেন। নিখোঁজরা হলেন সদর উপজেলার সৈয়দুল, বদরপাশার রাজন্দীর দারাদিয়ার সিদ্দিক আকনের ছেলে আসাদুল আকন (১৭), একই গ্রামের আব্দুল খালেক খালাসীর ছেলে আব্দুর রহিম খালাসী (২৮), দরপাশার পাঠানকান্দি গ্রামের নারায়ন চন্দ্র কায়েস্ত এর ছেলে সিতু কায়েস্ত বাপ্পী (২৫)।

বিবিসি বাংলা অনলাইন জানান, অপহরণের পর মিজদাতেই প্রায় ১৫ দিন অপহরণকারীদের জিম্মায় ছিলেন অভিবাসন প্রত্যাশী বাংলাদেশি ও সুদানি নাগরিকরা।

লিবিয়া নিযুক্ত বাংলাদেশ দূতাবাসের শ্রম বিষয়ক কাউন্সিলর আশরাফুল ইসলাম বিবিসি বাংলাকে জানান, “অপহরণকারীদের সাথে আটক হওয়া ব্যক্তিদের মুক্তিপণ নিয়ে দর কষাকষি চলছিল। আটককৃতদের অনেকেই পরিবারের সাথে যোগাযোগ করলেও কাঙ্তি মুক্তিপণ দিতে ব্যর্থ হয় তারা” মুক্তিপণ দিতে ব্যর্থ হওয়ায় আাটককৃতদের ওপর নির্যাতন চালাতে থাকে অপহরণকারীরা।

আশরাফুল ইসলাম বিবিসিকে আরও জানান, “এক পর্যায়ে বাংলাদেশিদের সাথে থাকা সুদানি নাগরিকরা অপহরণকারী চক্রের এক সদস্যকে মেরে ফেলেন। এরপর অপহরণকারীরা ুদ্ধ হয়ে আগ্নেয়াস্ত্র নিয়ে হামলা চালালে ৩৮ জন বাংলাদেশির সবাই গুলিবিদ্ধ হয়। মারা যায় ২৬ জন।” “গুলিবিদ্ধ হয়ে আহত অবস্থায় কয়েকজন ভিতরেই পড়ে ছিল, দুই-একজন আহত অবস্থায় বের হয়ে আসে। তাদের দেখে স্থানীয় লোকজন সেনাবাহিনীকে খবর দেয় এবং সেনাবাহিনী তাদের হাসপাতালে নিয়ে যাওয়ার ব্যবস্থা করে।”

নিখোঁজের দুই দিন আগে নির্মম নির্যাতনের করুণ আকুতিতে জানিয়েছিলেন সদর উপজেলার কুনিয়ার মনির আকন। তার কথা শুনে পরিবারও দালালদের দাবি করা ৭ লাখ টাকা সংগ্রহের চেষ্টা করছিল। কিন্তু তার আগেই লিবিয়িার মিলিশীয়া বাহিনীর হাতে নিঁখোজ হয় মনির আকন। বিষয়টি জানাজানি হলে পরিবারের নেমে আসে শোকের ছায়া। কান্নায় ভেঙ্গে পড়েন স্বজনরা। পরিবারের দাবী, স্থানীয় দালাল নূর হোসেনের মাধ্যমে পাঁচ মাস আগে ইতালি যাওয়ার কথা বলে সাড়ে চার লাখ টাকা নিয়েছিল। এখন মৃত্যুর সংবাদে গা-ঢাকা দিয়েছে নুর হোসেন। তবে তার ভাই লিবিয়া থেকে মোবাইলে বিষয়টি স্বীকার করেন।

রাজৈর উপজেলার রাজন্দী দারাদিয়া এলাকার আসাদুলের বাড়িতে গিয়ে দেখা যায়, অসুস্থ বাবা বিছানায় সন্তানের জন্য কাতরাচ্ছে। মা কান্না করতে করতে কিছুক্ষন পর মূর্ছা যাচ্ছে। বড় ভাই, বোন সবাই শোকে পাথর হয়ে আছে। তাদের একটি দাবি আসাদুল যে অবস্থায় আছে সেই অবস্থায় যেন দেশে আনার ব্যবস্থা করে সরকার।

বিদ্যানন্দী গ্রামের মানিক হাওলাদারের পিতা শাহ আলম হাওলাদার বলেন, আমার ছেলে মানিককে লিবিয়া নেওয়ার কথা বলে দালাল জুলহাস আমার কাছ থেকে প্রথমে ৪ লাখ টাকা নিয়েছে। পরে ছেলেকে বেনগাজী আটকে রেখে ভয়েজ রেকর্ডের মাধ্যমে ১০ লাখ টাকা দাবী করে। আমি আমার ছেলেকে আনতে জুলহাসের বাড়ি গিয়ে টাকা দিয়ে আসি। এখনো আমার ছেলের কোনো খোঁজ পাচ্ছি না।

জানা যায়, রাজৈর উপজেলার বদরপাশা ইউনিয়নের পাঠানকান্দি গ্রামের ছমেদ শেখের ছেলে দালাল নূর হোসেন শেখ এর ভাই আমীর হোসেন শেখ লিবিয়ার ত্রিপোলিতে থাকেন এবং বদরপাশার যারা আছেন তাদের সবাইকে তিনিই লিবিয়ায় নিয়েছেন। রাজৈর উপজেলার জুলহাস নামে এক দালালের কথা জানিয়েছে ক্ষতিগ্রস্ত পরিবার। এছাড়া সদর উপজেলার কুনিয়া ইউনিয়নের আদমপুর গ্রামের আলী হোসেন নামের এক দালালের মাধ্যমে কিছু লোক লিবিয়ায় গেছেন। এছাড়াও রেজাউল আকন নামে এক দালালের কথা জানান নিখোঁজ পরিবারের সদস্যরা।

রাজৈর উপজেলার ইশিবপুর ইউনিয়নের চেয়ারম্যান একেএম ফয়জুর রহমান বলেন, ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলো যেন দালালদের যে টাকা দিয়েছে সেই টাকা ক্ষতিপূরণসহ ফেরত পায় এবং এ ঘটনার সাথে যে সকল দালাল জড়িত তাদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দাবি করছি।

রাজৈর থানার ওসি শওকত জাহান বলেন, লিবিয়ায় লোক নেয়া দালাল রাজৈরের জুলহাস শেখের বাড়িতে এলাকাবাসী হামলা করে এমন সংবাদের ভিত্তিতে আমরা ওই বাড়িতে গেলে জুলহাস বলে আমার করোনা হয়েছে। করোনার কথা শুনে আমরা জুলহাস শেখকে মাদারীপুর সদর হসাপাতালের আইসোলেশনে ভর্তি করি। তবে কেউ যদি অভিযোগ করে আমরা তার বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা গ্রহন করবো।

মাদারীপুর জেলা প্রশাসক মো. ওয়াহিদুল ইসলাম বলেন, আমরা প্রবাসী কল্যাণ ও কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয় থেকে জানতে পেরেছি লিবিয়ায় নিহত ২৬ বাংলাদেশীদের মধ্যে মাদারীপুর জেলার ১১ জন রয়েছে। এছাড়া আহতদের মধ্যে তিনজন। নিহতদের লাশ বাংলাদেশে আনার জন্য সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় চেষ্টা করছেন এবং আহতদের যথাযথ চিকিৎসার ব্যবস্থা করছেন।

জেলা প্রশাসক আরও জানান, লিবিয়ার হত্যাকাণ্ডের সাথে যারা জড়িত তাদের বিরুদ্ধে আন্তর্জাতিকভাবে কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণ করা উচিত। পাশাপাশি বাংলাদেশী যারা এই ঘটনার সাথে জড়িত তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।

মাদারীপুর জেলায় প্রায় ৫০ হাজার মানুষ বিদেশে অবস্থান করছেন। এদের মধ্যে অনেকেই অবৈধপথে গিয়েছে, যার কারণে লোভে পরে অনেকেই দালালদের মাধ্যমে বিদেশে গিয়ে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। এসব দালালদের শাস্তির আওতার দাবি সচেতন মহলের।