রাহাত হোসাইনঃ
পুলিশের প্রতি বাংলাদেশের তৃণমূল মানুষের একটি নেতিবাচক ধারণা ছিল দীর্ঘদিনের। কিন্তু মানুষের সেই ধারণাকে পাল্টে দিয়েছে বাংলাদেশের করোনা পরিস্থিতি। করোনা পরিস্থিতিতে সারা বাংলাদেশের পুলিশের যে অগ্রণী ভূমিকা পালন করেছে, তা সত্যিই প্রশংসাযোগ্য। পুলিশ তাদের সেবা দিয়ে প্রমাণ করেছে আসলেই পুলিশ জনগণের বন্ধু। করোনা পরিস্থিতিতে পুলিশের কর্মকাণ্ডের কারণে মানবিক পুলিশ হিসেবে তাদের পরিচয় ফুটে উঠেছে। এখন এই সফলতা ভবিষ্যতে ধরে রাখা হচ্ছে পুলিশের জন্য অন্যতম চ্যালেঞ্জ।

করোনা ভাইরাসের কারণে সারা পৃথিবীর মানুষ ভীত-বিপর্যস্তÍ। সেখানে নিজের জীবনকে তুচ্ছ করে সেই করোনা পরিস্থিতিতে বাংলাদেশের মানুষকে ভালো রাখার জন্য কাজ করে যাচ্ছে পুলিশ বিভাগ। পুলিশের এ অসামান্য মানবিক ভূমিকার কারণে তাদের প্রতি বেড়েছে মানুষের শ্রদ্ধা। আর এই লেখাটা করোনা যোদ্ধা পুলিশ বিভাগের প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ। মাদারীপুর পুলিশ বিভাগের এই অসামান্য ভূমিকায় নেতৃত্ব প্রদান করেছেন মাদারীপুরের পুলিশ সুপার মোহাম্মদ মাহবুব হোসেন। তার যোগ্য নেতৃত্বেই করোনা পরিস্থিতিতে সচেষ্ট রয়েছে মাদারীপুর জেলা পুলিশ।

বাংলাদেশে সর্বপ্রথম করোনা রোগী শনাক্ত হয়েছিল তাদের মধ্যে একজন ছিল মাদারীপুর জেলার বাসিন্দা। মাদারীপুর জেলায় করোনা ভাইরাসের কারণে প্রথম পর্যায়ের সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিপূর্ণ জেলা এবং বাংলাদেশে সর্বপ্রথম লকডাউন ঘোষণা করা হয় শিবচর উপজেলাকে। আর করোনা প্রতিরোধে ও জনগণকে সচেতনতা করতে অন্যতম ভূমিকা পালন করছে পুলিশ বিভাগ। তাই মাদারীপুরে করোনা প্রতিরোধে অন্যান্য জেলা থেকে সবচেয়ে বেশি ভূমিকা পালন করছে মাদারীপুর পুলিশ বিভাগ।

Corona_Police_3

করোনা বিস্তার রোধে স্বাস্থ্য বিধি মানাতে পুলিশের অভিযান

করোনা পরিস্থিতিতে প্রথম পর্যায় মানুষের মধ্যে করোনা ভীতি দূর এবং সচেতনতা তৈরি ছিল অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি কাজ। পাশাপাশি করোনা ভাইরাস পজিটিভ হওয়া ব্যক্তিদের আইসোলেশনে নেওয়াও ছিল খুবই কষ্টকর ব্যাপার। কারণ করোনা ভাইরাসের ভীতির কারণে অনেকেই মিথ্যা তথ্য প্রদান করতেন এবং হাসপাতালের আইসোলেশনে যেতে ইচ্ছুক ছিলেন না। এমন পরিস্থিতিতে জেলা পুলিশ সুপার মাহবুব হাসানের নেতৃত্বে মাদারীপুর জেলা পুলিশ করোনা শনাক্ত হওয়া ব্যক্তিদের আইসোলেশনে নেওয়ার জন্য কার্যকরী ভূমিকা পালন করেন। কোন ব্যক্তি করোনা ভাইরাস পজিটিভ হলে শনাক্ত হওয়া ব্যক্তির বাড়িতে পুলিশের টিম গিয়ে আক্রান্ত ব্যক্তিকে হাসপাতালের আইসোলেশনে নেওয়ার ব্যবস্থা করেন।

করোনা ভাইরাসের ভীতি কাজ করতে তাদের নিজস্ব বাহিনীর মাধ্যমে সারা জেলায় প্রচার-প্রচারণা চালায়। মাইকিং, লিফলেট বিতরণ ও বিভিন্ন মানুষের দ্বারে দ্বারে গিয়ে তারা করোনা ভাইরাস প্রতিরোধ ও মানুষের মধ্যে জনসচেতনতা তৈরিতে প্রচারণা চালায়।
প্রথম পর্যায়ে সংক্রমণ কম থাকায় সংক্রমন বিস্তার রোধ করা যায় সে ব্যাপারে কাজ করে মাদারীপুর পুলিশ বিভাগ।

করোনা ভাইরাসের লক্ষণ রয়েছে এমন ব্যক্তি নমুনা প্রদানের পর রিপোর্ট না আসা পর্যন্ত নমুনা প্রদানকারী ব্যক্তিকে হোমকোয়ারেন্টাইনে যথাযথভাবে রাখার জন্য স্বাস্থ্য বিভাগের সাথে কাজ করে পুলিশ। পাশাপাশি শনাক্ত হওয়া ব্যক্তিদের বাড়ি লকডাউন এবং পরিবারের অন্যান্য সদস্যদের কোয়ারেন্টাইনের থাকার মতো গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে সরাসরি পদক্ষেপ গ্রহন করে মাদারীপুর জেলা পুলিশ।

বাংলাদেশের সর্বপ্রথম লকডাউন ঘোষণা করা হয় মাদারীপুর জেলার শিবচর উপজেলাটি। শিবচর উপজেলাকে ১৯ মার্চ লকডাউন ঘোষণা করা হয়। আর এই লকডাউন বাস্তবায়ন করার পেছনে গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করে মাদারীপুর পুলিশ বিভাগ।
মাদারীপুর জেলা পুলিশ সূত্র জানা যায়, লকডাউন কার্যকরভাবে বাস্তবায়ন করার জন্য তৎপর ছিল পুলিশ বাহিনী। অনেকগুলো টিম কাজ করে। করোনা ঝুঁকির মধ্যে কাজ করে পুলিশ বিভাগ।

Corona_Police_4

মাস্কবিহীন মানুষের মাঝে মাস্ক বিতরণ করছে জেলা পুলিশ বিভাগ

উপজেলাটিতে কার্যকর লকডাউনের সুফল এখনও ভোগ করছে শিবচর উপজেলা। কারণ সারা বাংলাদেশে সর্বপ্রথম ১৭ জন করোনা রোগীর মধ্যে ১০ জনই ছিল শিবচর উপজেলার। কিন্তু অদ্য পর্যন্ত (২৮ জুলাই) জেলার মধ্যে সবচেয়ে কম করোনা রোগী শনাক্ত হয়েছে উপজেলাটি। এই কৃতিত্বের বিরাট অংশের দাবিদার মাদারীপুর জেলা পুলিশ।

পরবর্তীতে ১৫ এপ্রিল মাদারীপুর জেলাকে লকডাউন ঘোষণা করা হয়। এর ফলে দায়িত্ব আরো বেশি বেড়ে যায় পুলিশের উপরে। পুরো জেলায় কার্যকর লকডাউন বাস্তবায়নের গুরু দায়িত্ব অর্পিত হয় মাদারীপুর জেলা পুলিশ বিভাগের উপর। আর সেই দায়িত্ব সিদ্ধহস্তে পালন করতে সক্ষম হয়েছেন পুলিশ সুপার মোহাম্মদ মাহবুব হোসেন। তার দক্ষ নেতৃত্বে পুরো জেলাটি কার্যকরভাবে বাস্তবায়ন হতে থাকে লকডাউনের সরকারি নির্দেশনাসমূহ।

পুলিশ বিভাগের অক্লান্ত পরিশ্রম ও কার্যকর লকডাউনের কারণে মাদারীপুর জেলায় সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ ও প্রথম রোগী শনাক্ত জেলা হলেও অন্যান্য জেলার তুলনা রোগী সংখ্যা অনেক কম বৃদ্ধি পায় মাদারীপুরে।

দক্ষিণবঙ্গের প্রবেশদ্বার হচ্ছে শিমুলিয়া-কাঁঠালবাড়ি ফেরিঘাটটি। করোনা পরিস্থিতির মধ্যে শুরু হয় মুসলিমদের সর্ববৃহৎ পবিত্র ঈদ-উল-ফিতর। ঈদের এই ঝুঁকিপূর্ণ যাত্রায় মাদারীপুর জেলা পুলিশ কাঁঠালবাড়ি ঘাটকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে করোনা ভাইরাস মোকাবেলা করতে প্রচেষ্টা চালায়। যদিও হাজার হাজার মানুষের ঘরে ফেরা রোধ করা যায়নি, তবে তাদের সর্বোচ্চ চেষ্টা ছিল মানুষকে সচেতন ও সামাজিক নিরাপদ দূরত্ব বজায় রেখে চলাফেরা করানোর।

করোনা ভাইরাসের এই দুর্যোগে পুলিশ তাদের দেশপ্রেমে উব্ধুধ হয়ে কাজ করে যায়। ঝুঁকিপূর্ণ এই কাজে মাদারীপুর জেলা পুলিশ বিভাগের সদস্যরাও আক্রান্ত হয়ে পড়ে। জেলা পুলিশ সূত্রে জানা যায়, জেলায় এ পর্যন্ত করোনা ভাইরাস আক্রান্ত হয়েছেন ৫২ জন পুলিশ সদস্য। এদের মধ্যে সুস্থ হয়েছেন ৪৮ জন। তবুও থেমে যায়নি তাদের তাদের কর্মকাণ্ড।

করোনা ভাইরাসে আক্রান্ত মৃত এক ব্যক্তির দাফন সম্পন্ন করছে পুলিশ সদস্যরা।

পুলিশ সুপার মোহাম্মদ মাহবুব হাসান মাদারীপুরের ২০১৯ সালের ২২ জুলাই যোগদান করেন। ১৯৭৭ সালের ৩১ ডিসেম্বর কুমিল্লা জেলায় জন্ম নেওয়া মাহবুব হোসেন জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ইংরেজিতে অনার্স-মার্স্টাস করার পর ২০০৫ সালের ২ জুলাই বাংলাদেশ পুলিশ বাহিনীতে এএসপি হিসেবে যোগদান করেন। স্ত্রী মোসা. তাহমিনা আক্তার কর্মরত রয়েছেন যুগ্ম কর কমিশনার হিসেবে কর অঞ্চল-৩, ঢাকায়। রামিন ও রাঈদা নামে দুটি কন্যা সন্তানের জনক তিনি। কন্যারা পঞ্চম ও তৃতীয় শ্রেণিতে অধ্যায়নরত।

মাদারীপুর পুলিশ সুপার মোহাম্মদ মাহবুব হাসান বলেন, বৈশ্বিক মহামারী হচ্ছে কোভিড-১৯ করোনা ভাইরাস। সারা পৃথিবীর মতো বাংলাদেশেও করোনা ভাইরাসের ভয়াবহতার প্রভাব পড়ে। মাদারীপুর জেলাটি হচ্ছে করোনা ভাইরাসে শনাক্ত প্রথম জেলার মধ্যে একটি। পাশাপাশি মাদারীপুর জেলাটি একটি ব্যবসায়ী জোন ও প্রচুর প্রবাসী থাকায় করোনা ভাইরাসের সংক্রমন বিস্তার লাভের ঝুঁকিটাও বেশি। মাদারীপুর জেলা পুলিশ বিশ্বে করোনা ভাইরাস ছড়িয়ে যাওয়ার পর থেকেই করোনা ভাইরাস মোকাবেলার জন্য প্রস্তুতি গ্রহণ করে। বাংলাদেশে করোনা ভাইরাসের প্রাদুর্ভাব শুরু পূর্ব থেকেই আমরা মানুষকে করোনা ভাইরাস প্রতিরোধ ও করোনা ভাইরাসের বিষয়ে সচেতন করতে শুরু করি।

তিনি আরও জানান, মাদারীপুরে করোনা রোগী শনাক্ত হওয়ার পর থেকেই আমরা আরো বেশি তৎপর হয়ে উঠি। জনসাধারণকে করোনা ভাইরাসের বিষয়ে সচেতনতা বৃদ্ধি ও করোনা ভাইরাসের ভীতি দূর করার জন্য কাজ করতে থাকি। পাশাপাশি বিদেশ ফেরত, করোনা ভাইরাসের আক্রান্ত ও উপসর্গ থাকা ব্যক্তিদের হোম কোয়ারেন্টাইন ও আইসোলেশনের বিষয়টি নিশ্চিত করি। এছাড়া জেলা, উপজেলা ও শনাক্ত হওয়া ব্যক্তিদের ঘর ও এলাকায় যথাযথ লকডাউন করার জন্যও সচেষ্ট থাকি।

পুলিশ সুপার বলেন, করোনা ভাইরাস মোকাবেলায় কাজ করতে গিয়ে আমাদের ৫২ জন সদস্য আক্রান্ত হয়েছেন। মাদারীপুরের শনাক্ত হওয়া পুলিশ সদস্যদের জন্য মাদারীপুর পুলিশ লাইনস এর ভেতর অবস্থিত বন্ধ থাকা প্রাথমিক বিদ্যালয়, ইন-সার্ভিস সেন্টার ও প্রশিক্ষণ কেন্দ্রে ৪৮টি বেড বিশিষ্ট আইসোলেশন কেন্দ্র স্থাপন করা হয়েছে। সেখানে আমাদের বাহিনীর চিকিৎসক ও স্বাস্থ্য বিভাগের সহযোগিতায় চিকিৎসা ব্যবস্থা করা হয়। পাশাপাশি তাদের দ্রুত সুস্থতার জন্য উন্নত মানের খাবার সরবরাহ করা হয়। এর ফলে বর্তমানে ৫২ জনের ৪৮ জন সদস্যই করোনাকে জয় করেছেন।

তিনি আরও জানান, আমাদের পুলিশ সদস্যদের মধ্যে সামাজিক দূরত্ব বজায় রেখে থাকাটা অনেকটাই কষ্টসাধ্য হওয়া সত্ত্বেও দূরত্ব বজায় রাখার জন্য মাদারীপুর যুব উন্নয়ন এর প্রশিক্ষণ ভবনটি অস্থায়ীভাবে পুলিশ সদস্যদের থাকার ব্যবস্থা করা হয়েছে। এছাড়া পুলিশ সদস্যদের মানসিকভাবে সুস্থ রাখার জন্য নিয়মিত শরীরচর্চার ব্যবস্থা করা হচ্ছে। কোন বাধাই আমাদের যুদ্ধে থেকে বিরত রাখতে পারেনি।  আমরা আমাদের সর্বোচ্চ প্রচেষ্টা দ্বারা করোনা ভাইরাস মোকাবেলার জন্য চেষ্টা করেছি।

Corona_Police_5

বিকেলে মাদারীপুর পুলিশ লাইনস মাঠে শরীরচর্চা ব্যস্ত পুলিশ সদস্যরা।

করোনা ভাইরাসের কারণে পৃথিবীর এই ক্রান্তিকালে সবচেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ বিভাগ হচ্ছে স্বাস্থ্য বিভাগ। আর সেই স্বাস্থ্য বিভাগের পরই গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে যাচ্ছে পুলিশ বিভাগ। এরাই এখন পৃথিবীর সবচেয়ে বড় হিরো। এরা নিজের জীবনকে তুচ্ছ মনে করে কাজ করে যাচ্ছেন করোনা ভাইরাস মোকাবেলায়। এরাই আসল বীরযোদ্ধা। মাদারীপুর পুলিশ বিভাগও সর্বোচ্চ চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন মাদারীপুর জেলাকে করোনা ভাইরাসের প্রভাব থেকে যতদূর সম্ভব রক্ষার জন্য। একদিন হয়তঃ এই করোনা ভাইরাস শেষ হয়ে যাবে, আবার সচল হবে পৃথিবী। সেই দিন এসব নিবেদিত মানুষগুলোই হবেন সবচেয়ে সম্মানিত ব্যক্তি। আর আমরা যদি সেই দিন তাদের যথাযথভাবে মূল্যায়ন না করি তাহলে আমরাই হবো সবচেয়ে নিচু মানসিকতার মানুষ।

ধন্যবাদ জানাই মাদারীপুর পুলিশ সুপার মোহাম্মদ মাহবুব হাসানসহ জেলা পুলিশ বিভাগে কর্মরত সকল সদস্যদেরকে। কারণ পুলিশ সুপারের পুরো বাহিনী জীবনবাজি রেখে কাজ করে যাচ্ছেন জনসাধারণকে করোনা ভাইরাসের প্রভাব থেকে মুক্ত রাখার জন্য সংক্রমন বিস্তার রোধের জন্য। আমাদের এই ধন্যবাদ হয়ত তাদের এই অবদানের কাছে নগণ্য, তবুও সামান্য কৃতজ্ঞতা প্রকাশ।

লেখক: প্রকাশক, বাংলারশিক্ষা ও জেলা প্রতিনিধি, চ্যানেল আই।