জাকির হোসেন, ম্যানচেস্টার, ইংলান্ডঃ

মাদারীপুরের প্রথম কিন্ডারগার্টেন স্কুল “উদয়ের পথে শিশু বিদ্যালয়”টি আর নেই। কোন এক দুর্বোধ্য কারনে তার নাম পরিবর্তন করে ডিসি একাডেমী করা হয়েছে। কেন করা হয়েছে? মাদারীপুরবাসী তা বুঝতে পারে না।

প্রতিষ্ঠা লগ্ন থেকে স্কুলটি আধুনিক ও উন্নতমানের শিক্ষা দানের মধ্য দিয়ে ব্যাপক জনপ্রিয়তা ও গ্রহনযোগ্যতা পায়। এই স্কুলটির অগুনতি প্রাক্তন ছাত্র ছাত্রী রয়েছে, রয়েছে তাদের স্বর্নালী স্মৃতি। এমনকি স্কুলটির স্থান ও অবকাঠামোও রয়েছে যথাস্থানে। শুধু মাত্র স্কুলটি আর নেই। তাদের এই শৈশবের স্মৃতি বিজড়িত বিদ্যাপিঠের এমনধারা বেহাত হওয়া নিয়ে তাদের মধ্যে ক্ষোভ রয়েছে, রয়েছে মর্মবেদনা। তবে এ বিষয়ে কিছু করা যায় নি, এমনকি এ নিয়ে কিছু বলাও যায় নি। কারন কিছু বলতে গেলে ক্ষমতাবান ও প্রভাবশালী মহলের মুখোমুখী হতে হয়।

এ প্রসঙ্গে প্রাক্তন ও বর্তমান কিছু ছাত্র ছাত্রী ও শিক্ষক শিক্ষিকার সাথে কথা বলে তাদের ক্ষোভ ও হতাশার করুন আর্তনাদ শোনা যায়। নাম প্রকাশ না করার শর্তে ক`জন শিক্ষিকা আমাদেরকে জানান, “আমরা প্রতিবাদ করতে চেয়েছি, কিন্তু চাকুরীর ভয়ে কিছু বলতে পারিনি।

তাদের হতাশা শুনে মনে হয়, “উদয়ের পথে শিশু বিদ্যালয়”টি ছিল তাদের নিজের লালিত সন্তানের মত। অথচ অবস্থা দাড়িয়েছে এমন, যেন নিজের লালিত সন্তানের লাশটি পাশে রেখে তারা পরের সন্তানকে লালন পালন করে চলেছেন। তারা তা করে চলেছেন প্রথমত প্রতিষ্ঠানটির প্রতি পরম মমত্ববোধ থেকে, অন্যদিকে চাকুরী রক্ষার খাতিরে।

“উদয়ের পথে শিশু বিদ্যালয়” নামটি শিশুতোষ এবং শিশু শিক্ষা সংশ্লিষ্ট হিসেবে গভীর অর্থ বহন করে। এই নামটি নিয়ে কারো আপত্তি থাকার কথা নয়, কারো আপত্তি ছিলও না। তাহলে কেন এই অযাচিত নাম পরিবর্তন?

কারন অনুসুন্ধান করলে নতুন নামের মধ্যেই এর সূত্র পাওয়া যাবে। নতুন নাম “ডিসি একাডেমী”। কেন ডিসি একাডেমী, কিভাবে হল ডিসি একাডেমী? অনুসন্ধান করতে গিয়ে চাঞ্চল্যকর তথ্য পাওয়া গেল। দুই যুগেরও বেশী সময় ধরে যে প্রতিষ্ঠানটি শুধু সাফল্যই অর্জন করেছে, তার উপর লোলুপ দৃষ্টি পরেছে কেবল্ মাত্র ব্যাক্তি ও গোষ্ঠী স্বার্থ জনিত কারনে।

যার সুচনা হয় ২০০৩ সালে। ১৯৭১ সালে বাংলাদেশের স্বাধীনতার মধ্য দিয়ে জাতীয় জন মানসে যে শিক্ষা, সংস্কৃতি ও জাতীয় বিকাশের নতুন উদ্দীপনার জাগরণ ঘটে তার প্রত্যক্ষ প্রভাব পড়ে মাদারীপুরের ক্ষেত্রেও। এরই ধারাবাহিকতায় মাদারীপুরের শিক্ষা ক্ষেত্রে নতুন ধারার কোনো শিক্ষা প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলার প্রয়োজনীয়তা অনুভূত হতে থাকে।

গতানুগতিক প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা ব্যবস্থায় আধুনিকতা আনার তাগিদ ছিল এই ভাবনার প্রধান চালিকা। সেই তাগিদ থেকে স্থানীয় কিছু শিক্ষানুরাগী, অভিভাবক ও সমাজ সেবকের উদ্যোগে আধুনিক শিক্ষা ব্যবস্থার সাথে সঙ্গতি রেখে একটি শিশু বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার উদ্যোগ নেয়া হয়। পরবর্তীতে যা কিনা মাদারীপুরে প্রথম কিন্ডারগার্টেন হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হয়।

স্বাভাবিক ভাবেই সদ্য স্বাধীন দেশে নতুন কোনো শিক্ষা প্রতিষ্ঠান এবং কাঠামো গড়ে তোলার ক্ষেত্রে স্থানীয় ভাবে সক্ষমতার সীমাবদ্ধতা ছিল। সে কারনে স্থানীয় অবস্থাপন্ন ব্যাক্তি বর্গকে সম্পৃক্ত করার প্রয়োজনীয়তা দেখা দেয়।

স্কুলের প্রতিষ্ঠাকালীন ছাত্র শিক্ষকদের কারো কারো কাছ থেকে জানা গেছে, স্থানীয়দের উৎসাহ ও তাগিদ উপলব্ধি করে এই উদ্যোগের সাথে সম্পৃক্ত হন তৎকালীন মহকুমা প্রশাসক জনাব আব্দুল জলিল খান ও তার স্ত্রী। যার ফলে অচিরেই একটি নতুন ধারার শিশু বিদ্যালয় গড়ে ওঠার বাস্তব ভিত্তি তৈরী হয়। সেই ধারাবাহিকতায় নতুন স্কুলের নাম, স্থান, শিক্ষা পদ্ধতি ও স্কুলের পরিকাঠামো গড়ে তোলার কাজ ত্বরান্বিত হয়।

আমাদের হাতে প্রাপ্ত কিছু দলিল পত্রে সর্ব প্রথম ১৯৭৫ সালে ছাত্র ভর্তির তথ্য পাওয়া যায়। স্কুলের আনুষ্ঠানিক শুরুর সময়ের দুজন শিক্ষিকার একজন, সৈয়দা মাহমুদা বেগম এর সাথে আলোচনায়ও আমরা এ বিষয়ে বেশ কিছু তথ্য পাই। তিনি জানান প্রাথমিক ভাবে স্কুলের উদ্যোক্তাদের সাথে মহকুমা প্রশাসক এবং তার স্ত্রীর জোড়ালো অংশগ্রহন থাকলেও তা যত না ছিল সরকারী দায়িত্ব হিসেবে, তার চেয়ে বেশী ছিল তাদের ব্যাক্তিগত দায়ীত্ববোধ, উৎসাহ ও সদিচ্ছা থেকে।

এখানে উল্লেখ করা জরুরী যে, গতানুগতিক ধারার বাইরে আধুনিক শিক্ষা পদ্ধতিই কেবল নয়, শিক্ষার্থীদের শারীরিক ও মানষিক উৎকর্ষ সাধনের পাশাপাশি দেশপ্রেমে উদ্বুদ্ধ করনও শিক্ষা দানের অন্যতম লক্ষ্য হিসেবে বিবেচ্য ছিল। সামগ্রীক বিবেচনায় নব্য স্বাধীন দেশে, নতুনতর চেতনায় একটি আধুনিক, মননশীল ও দেশ প্রেমিক নতুন প্রজন্ম উদয়ের প্রত্যাশায় গড়ে তোলা স্কুলটির নাম স্বাভাবিক ভাবেই “উদয়ের পথে শিশু বিদ্যালয়” নির্ধারিত হয়।

এ প্রসঙ্গে স্কুলের নথিপত্র থেকে জানা যায় তৎকালীন মহকুমা প্রশাসক জনাব আব্দুল জলিল খানের সভাপতিত্বে স্কুলটির বিভিন্ন নাম প্রস্তাব হলেও “উদয়ের পথে শিশু বিদ্যালয়” নামটি সর্ব সম্মতিক্রমে গৃহিত হয়। ১৯৭৫ সালের মার্চ মাসে প্রথম ছাত্র ভর্তির মধ্য দিয়ে স্কুলের শিক্ষা কার্যক্রম শুরু হলে স্থানীয় বিদ্যোৎসাহী মহলে স্কুলটি ব্যাপক আগ্রহের সৃষ্টি করে।

প্রথমবস্থায় স্কুলের নিজস্ব কোনো স্থান বা ভবন না থাকলেও স্বল্প সংখ্যক ছাত্র ছাত্রী নিয়ে স্কুলটি শুরু হয় শকুনী লেকের পশ্চিম পাড়ে তৎকালীন লেক ভিউ ক্লাবের স্বল্প পরিসরে। বলাই বাহুল্য জন আকাঙ্ক্ষার প্রাবল্য ও উদ্যোক্তাদের উদ্যোমে স্কুলটির ছাত্র ছাত্রী সংখ্যা দ্রুতই বৃদ্ধি পেতে থাকে। যার ফলে যত দ্রুত সম্ভব স্কুলের নিজস্ব স্থান ও ভবন গড়ে তোলার বিষয়টি গুরুত্বপুর্ন হয়ে ওঠে।

অবশেষে লেকভিউ ক্লাব সংলগ্ন ও শকুনী লেকের দক্ষিন পশ্চিম কোনে, স্থানীয় বাসিন্দা সৈয়দা রাজিয়া সুলতানা, পিতা মৃত সৈয়দ কফিলউদ্দিন আহমে্দ‌, নিজ বাস ভবন সংলগ্ন কিছু জমি দান করলে সেখানে বিভিন্ন মহলের অনুদান ও সহযোগীতায় স্কুলের নিজস্ব ভবন গড়ে ওঠে।

স্কুলের নথি পত্র থেকে জানা যায়, ১৯৭৭ সনের ৭ই এপ্রিল তৎকালীন ফরিদপুর জেলা প্রশাসক আব্দুল জলিল খান কতৃক নতুন ভবন উদ্বোধনের মধ্য দিয়ে স্কুলটির নবযাত্রা শুরু হয়। এখানে উল্লেখ করা জরুরী যে জনাব আব্দুল জলিল খান ছিলেন স্কুলের প্রতিষ্ঠাকালীন সময়ে মাদারীপু্র এর মহকুমা প্রশাসক, স্কুলের অন্যতম প্রতিষ্ঠাতা ও স্কুলটির প্রথম পরিচালনা কমিটির সভাপতি। এরপর থেকে উত্তরোত্তর সাফল্যের ধারাবাহিকতায় স্কুলটি তার অভিষ্টের দিকে এগিয়ে যেতে থাকে। তবে এই অগ্রযাত্রায় ছেদ ঘটে ২০০৩ সালে এসে।

উদয়ের পথে শিশু বিদ্যালয়, নামেই যার পরিচয়। স্কুলটি শুরু থেকে তেমনই একটি অর্থবহ পরিচয় বহন করে চলছিল। শুধু নামেই নয়, প্রতিষ্ঠাকাল থেকে স্কুলটি একটি প্রত্যয় ও অঙ্গীকার বাস্তবায়নেরও সফল উদাহরন। এই সাফল্য চলমান থাকে বিগত দশকের শুরুর দিক পর্যন্ত।

স্বাভাবিক ভাবেই তখন পর্যন্ত স্কুলটির সাফল্য, অর্জন ও তার সমগ্রীক কার্যক্রমের সাথে নামের সার্থকতার বিষয়ে কোনো প্রশ্ন দেখা দেয় নি। তা সত্বেও ২০০৩ সালে তৎকালীন স্কুল পরিচালনা কমিটি কি কারনে নাম পরিবর্তনে উদ্যোগী হল? প্রসঙ্গত উল্লেখযোগ্য, এই স্কুল পরিচালনা কমিটিতে বিধি মতো সভাপতি হয়ে থাকেন চলতি দায়িত্বপ্রাপ্ত জেলা প্রশাসক। কমিটিতে অন্যান্যের সাথে স্থানীয় প্রশাসনিক কর্মকর্তা ও জনপ্রতিনিধিদের কেউ কেউ বিভিন্ন পদে দায়িত্ব পালন করে থাকেন।

এমন একটি কমিটির তাৎক্ষনিক মনে হওয়াই স্কুলের নাম পরিবর্তনের একমাত্র কারন, নাকি অন্য কিছু তা নিয়ে মাদারীপুরবাসীর কাছে আগাগোড়াই প্রশ্ন ছিল। অনুসন্ধানে জানা গেল পরিবর্তনের পেছনে কিছু চাঞ্চল্যকর তথ্য। স্কুলটির ডিসি একাডেমী নাম করনের কারন অনুসন্ধান করতে গিয়ে আমরা মাদারীপুরের কিছু সামাজিক ব্যাক্তিত্ব ও স্কুল সংশ্লিষ্ট ব্যাক্তি বর্গের সাথে যোগাযোগ করি।

সেই সূত্রে জানা যায়, ২০০৩ সালে প্রশাসনের উচ্চ পর্যায় থেকে এক পরিপত্র আসে যে বাংলাদেশের প্রতিটি জেলায় প্রশাসনের উদ্যোগে একটি করে মাধ্যমিক স্কুল প্রতিষ্ঠা করা হবে, যা কিনা পরিচালিত হবে প্রশাসন সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠান বিয়াম ফাউন্ডেশনের প্রত্যক্ষ তত্বাবধানে। যার পরিপ্রেক্ষিতে মাদারীপুরের তৎকালীন জেলা প্রশাসক জনাব আব্দুল মালেক এমন একটি স্কুল প্রতিষ্ঠায় উদ্যোগী হন।

তৎকালীন উদয়ের পথে শিশু বিদ্যালয় সংশ্লিষ্টদের সূত্রে জানা যায় যে, নতুন একটি স্কুল প্রতিষ্ঠার প্রয়োজনে সংস্থাপন মন্ত্রনালয় থেকে প্রয়োজন মতো অর্থ যোগানেরও ঘোষণা দেয়া হয়। তা সত্বেও স্থানীয় প্রশাসন নতুন করে তেমন একটি স্কুল প্রতিষ্ঠার উদ্যোগ না নিয়ে কি কারনে একটি প্রতিষ্ঠিত স্কুল, অর্থাৎ উদয়ের পথে শিশু বিদ্যালয়ের নাম পরিবর্তন করে ডিসি একাডেমীতে রূপান্তরে উদ্যোগী হলেন, যেখানে নতুন স্কুল প্রতিষ্ঠায় অর্থ যোগানের কোনো সমস্যা ছিল না।

ডিসি আব্দুল মালেক এর সময়ে স্কুল প্রতিষ্ঠা ও অবকাঠামো উন্নয়নে পর্যাপ্ত অর্থ বরাদ্দ হলেও সে অর্থ কোথায় ব্যয় হয়েছে সে বিষয়েও কোনো হদিস পাওয়া যায়নি। আগেই বলা হয়েছে, উদয়ের পথে শিশু বিদ্যালয়টি প্রতিষ্ঠার পর থেকেই স্কুলের গঠনতন্ত্র অনুযায়ী স্কুল পরিচালনা কমিটিতে স্থানীয় প্রশাসনের প্রাধান্য রয়েছে।

যেখানে পদাধিকার বলে কমিটির সভাপতি হয়ে থাকেন স্থানীয় প্রশাসনিক প্রধান, যিনি কিনা বর্তমানের জেলা প্রশাসক। স্বভাবতই প্রশাসনিক অবস্থানগত কারনে স্কুল পরিচালনায় যে কোনো সিদ্ধান্ত নেয়ার ক্ষেত্রে তার ভূমিকাই মূখ্য।

এ প্রসঙ্গে জানা যায় যে, উদয়ের পথে শিশু বিদ্যালয় থেকে ডিসি একাডেমীতে রুপান্তরের ক্ষেত্রে স্কুল পরিচালনা কমিটিতে স্থানীয় নাগরিক প্রতিনিধিদের প্রবল আপত্তি থাকা সত্বেও তৎকালীন প্রশাসন তাতে কর্নপাত করেনি।

একই ভাবে নতুন স্কুল প্রতিষ্ঠার জন্য যে অর্থ বরাদ্দ হয়েছে স্কুল উন্নয়নের ক্ষেত্রে তার কতটা ব্যয় হয়েছে সে বিষয়েও অস্পষ্টতা রয়েছে। বিভিন্ন সূত্রে খোজ নিয়ে জানা যায় যে, ত্ৎকালীন জেলা প্রশাসক জনাব আব্দুল মালেক স্কুলটিকে ডিসি একাডেমীতে রুপান্তরের যাবতীয় আয়োজন সম্পন্ন করলেও রহস্য জনক কারনে তিনি সেটা ঘোষনা দিয়ে বা বাস্তবায়ন করে যাননি।

২০০৪ সাল হতে বাকি কাজ টুকু সম্পন্ন করতে পর্যায়ক্রমে উদ্যোগী হন তার পরবর্তি ডিসি জনাব আকরাম হোসেন ও শশী কুমার সিংহ। কিন্তু বিপত্তি বাধে অন্য জায়গায়, অর্থাৎ একটি মাধ্যমিক বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার জন্য ন্যুনতম যে পরিমান জমি প্রয়োজন তা সেখানে না থাকায় তাদেরকে অন্যত্র জমি দেখাতে হয়।

সেক্ষেত্রে জেলা প্রশাসনের তরফ থেকে শকুনি লেক এর দক্ষিন পাড়ে শিল্পকলা ভবন সংলগ্ন একটি সরকারী খাস জমি বরাদ্দ দিয়ে আপাতত বিষয়টির সুরাহা করার চেষ্টা করলেও পরবর্তিতে জাতীয় শিক্ষা বোর্ড থেকে তদন্তে এলে জানা যায় যে বরাদ্দকৃত স্থানটি একটি বিতর্কিত অর্পিত সম্পত্তি। যার ফলে জাতীয় শিক্ষা বোর্ড রুপান্তরিত ডিসি একাডেমীটিকে একটি মাধ্যমিক স্কুল হিসেবে অনুমোদন দেয়া থেকে বিরত থাকে।

ইতঃমধ্যে রূপান্তরিত ডিসি একাডেমী মাধ্যমিক স্কুল হিসেবে তিনবার এসএসসি পরীক্ষায় অংশ গ্রহন করে এবং ফলাফল অর্জন করে। তবে জাতীয় শিক্ষা বোর্ড কর্তৃক মাধ্যমিক স্কুল হিসেবে অনুমোদন না পাওয়ায় স্থানীয় প্রশাসন স্কুলটিকে আবার প্রাথমিক বিদ্যালয়ের পর্যায়ে ফিরিয়ে নিতে বাধ্য হয়। সে ক্ষেত্রে স্কুলটির কোনো গুনগত পরিবর্তন না হলেও ডিসি একাডেমী নামটি রয়ে যায়।

সামগ্রীক পরিস্থিতিতে প্রশাসনিক পরিকল্পনা অনুযায়ী ডিসি একাডেমীকে একটি মাধ্যমিক স্কুল হিসেবে প্রতিষ্ঠা করার ফলাফল অর্জিত না হওয়ায় জেলা প্রশাসন মাদারীপুর জেলা শহরে নতুন করে একটি মাধ্যমিক স্কুল প্রতিষ্ঠার উদ্যোগ নেয় এবং অতি সম্প্রতি তারা “বিয়াম ল্যাবরেটরি স্কুল” নামে একটি স্কুল প্রতিষ্ঠা করে।

সে ক্ষেত্রে স্বাভাবিক ভাবেই ভূতপূর্ব উদয়ের পথে শিশু বিদ্যালয়টির আর ডিসি একাডেমী নাম বহন করার কোনো যৌক্তিক কারন থাকে না। অথচ অবস্থা দৃষ্টে মনে হয় প্রশাসনের এ বিষয়ে কোনো ভ্রুক্ষেপ নেই। এমনকি বিয়াম লাবরেটরি স্কুলটি প্রশাসনের কাছে বেশি গুরুত্ব পাবার কারনে দৃশ্যত “ডিসি একাডেমী” গুরুত্বহীন হয়ে পড়ে। যার ফলে স্কুলের শিক্ষক শিক্ষিকা ও কর্মচারীরা দীর্ঘ সাত মাস যাবৎ বেতন ভাতা পাওয়া থেকে বঞ্চিত রয়েছেন।

আশির দশকের শুরু থেকে সমগ্র দেশে জনসংখ্যা বৃদ্ধির সাথে সাথে মানসম্মত শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের অভাব উপলব্ধি হতে শুরু করে। এই প্রেক্ষিতে চাহিদার সাথে পাল্লা দিয়ে দেশ জুড়ে নানান ধারার শিক্ষা প্রতিষ্ঠান গড়ে উঠতে থাকে। শহুরে উঠতি মধ্যবিত্তের চাহিদা মত, বিশেষ করে ইংরেজী মাধ্যম ও বিদেশী কারিকুলামে শিক্ষা দানের প্রবণতা বেশি প্রাধান্য পায়।

দেশ ব্যাপী শিক্ষার বাণিজ্যিকী করন ও বিদেশী ভাবধারার প্রবনতার বিপরীতে এ ক্ষেত্রে মাদারীপুরের “উদয়ের পথে শিশু বিদ্যালয়” ছিল একটি ব্যাতিক্রমী প্রতিষ্ঠান। মূলত উদয়ের পথে শিশু বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার পেছনে স্থানীয় ভাবে সামাজিক দায়বদ্ধতা ও জাতীয় চেতনা প্রধান অনুপ্রেরনা হিসেবে কাজ করায় মূল চেতনা থেকে বিচ্যুত হবার সুযোগ ছিলনা।

শিক্ষার গুনগত মান ও উদয়ের পথে শিশু বিদ্যালয় নামটিও লক্ষ্য অর্জনে প্রেরনা হিসেবে কাজ করে। সেই চেতনার জায়গা থেকে স্কুলটির প্রাক্তন ছাত্র ছাত্রী সহ সমস্ত মাদারীপুরবাসী প্রথম থেকেই যেমন এই পরিবর্তন মেনে নিতে পারেনি তেমনি, বর্তমানেও সর্ব মহলে একই রকমের অসন্তোষ বিরাজ করছে।

অতি সম্প্রতি মাদারীপুর শকুনি লেক নাম রক্ষা আন্দোলনের প্রেক্ষিতে, শকুনি লেক এর নাম পরিবর্তন করা হবে না এবং মাদারীপুরের সকল ইতিহাস ও ঐতিহ্য সংরক্ষণ করা হবে, মর্মে বর্তমান জেলা প্রশাসকের ঘোষনা মাদারীপুরবাসীকে নতুন করে আশাবাদী করে। যার ফলে উদয়ের পথে শিশু বিদ্যালয় নাম পুনর্বহাল প্রশ্নে ইতঃমধ্যে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম সহ বিভিন্ন মহলে নতুন করে বিষয়টি আলোচনায় আসে।

সামগ্রীক অবস্থার পরিপ্রেক্ষিতে পূর্বতন জেলা প্রশাসন যদি কোন ভুলও করে থাকে তাহলে তা বর্তমান প্রশাসনের সংশোধন করার সুযোগ রয়েছে। জনগণ ও প্রশাসন স্বভাবতই পরস্পরের প্রতিপক্ষ হবার কথা নয়। ঊদয়ের পথে শিশু বিদ্যালয় বিষয়ে মাদারীপুরবাসী তেমনি সহযোগীতা মূলক অবস্থানেই রয়েছে বলে প্রতীয়মান হয়। বর্তমান জেলা প্রশাসন একই রকম সহযোগীতা প্রদর্শন করলে বিষয়টির একটি গ্রহণযোগ্য সমাধান হবে বলে আশাবাদী হবার কারণ রয়েছে ।