mofossol-journalরাহাত হোসাইন :
সাংবাদিকরা জাতির বিবেক। সমাজের দর্পণ। সেই সাংবাদিকদের পেশা সাংবাদিকতার বিরাট অংশ জুড়েই রয়েছে মফস্বলের সাংবাদিকতা। অর্থাৎ সাংবাদিকতার মূল শিকড় মফস্বল শহরে। সেই মফস্বলের সাংবাদিকতা কতটা সফল পেশা হিসেবে আত্মপ্রকাশ করতে পেরেছে স্বাধীনতার এই ৫০ বছরে। বাংলাদেশ স্বাধীনতার লাভের পর অন্যান্য পেশা যেভাবে স্বীকৃতি পেয়ে, আত্মপ্রকাশ করেছে এবং পেশাদারিত্ব ভাবে গড়ে উঠেছে তার কিয়দাংশও পেশাদারিত্ব পায়নি মফস্বলের সাংবাদিকতা।

অন্যান্য পেশার মত শুধুমাত্র মফস্বলের সাংবাদিকতাকে পেশা হিসেবে গ্রহণ করে সফল হয়েছে এমন মফস্বলের সাংবাদিক পাওয়া দুস্কর। বেশিরভাগ ক্ষেত্রে দেখা যায়, মফস্বলের যে সব সাংবাদিক শুধুমাত্র সাংবাদিকতা পেশা হিসেবে নিয়েছেন তাদের সমস্ত জীবনেই অভাব তাড়া করে বেড়িয়েছে। অস্বচ্ছলতা, হতাশা, দারিদ্রতা হয়েছে তাদের জীবনের সঙ্গী।

ঢাকাসহ বিভিন্ন বিভাগীয় পর্যায় সাংবাদিকতা একটি প্রতিষ্ঠিত পেশা হলেও মফস্বলের শহরের জন্য তা অনেকটাই দূরাশা। ঢাকার সাংবাদিকদের জন্য মিডিয়া হাউসগুলো সরকার ঘোষিত ওয়েজবোর্ডগুলো বাস্তবায়ন করলেও মফস্বল শহরের জন্য তা মোটেও তাদের বিবেচ্য বিষয় মনে করেন না। ফলে বেতন কাঠামোগুলো বিভাগীয় শহরের থেকে মফস্বল শহরের সাথে ব্যবধান থাকে আকাশ-পাতাল। যার কারণে বিভাগীয় শহরে যেখানে বর্তমানে সাংবাদিকতা একটি সফল পেশা, সেখানে মফস্বল শহরের জন্য একটি হতাশাব্যঞ্জক পেশা।

পূর্বে অধিকাংশ মিডিয়া হাউসগুলো মফস্বলের সাংবাদিকদের জন্য তেমন কোন নির্ধারিত বেতন না থাকলেও বর্তমানে প্রায় অধিকাংশ প্রতিষ্ঠিত মিডিয়া হাউসগুলো একটি নির্দিষ্ট বেতন কাঠামো প্রদান করছে। যদিও তা প্রয়োজনের তুলনা অত্যন্ত অপ্রতুল এবং সেই সব মিডিয়াগুলোর সংখ্যাও নগন্য। যার কারণে অধিকাংশ মফস্বলের সাংবাদিকদের বিকল্প আয়ের উৎসের কথা চিন্তা করতে হয়। সাংবাদিকতা পেশার পাশাপাশি তাদের আত্মনিয়োগ করতে হয় ভিন্ন পেশায় বা ভিন্ন পথে।

দিন দিন বাংলাদেশে বৃদ্ধি পাচ্ছে পত্রিকা, টেলিভিশন এবং অনলাইন মিডিয়া। ফলে মফস্বলেও বৃদ্ধি পাচ্ছে সাংবাদিকদের সংখ্যা, সাথে সাথে বৃদ্ধি পাচ্ছে সাংবাদিকতা পেশার ব্যক্তিদেরও সংখ্যা। তবে অনেক ক্ষেত্রে বৃদ্ধি পাচ্ছে না সাংবাদিকদের মান কিংবা সম্মানী।

মিডিয়া এখন ব্যবহৃত হচ্ছে অনেকটা ব্যবসায়ীদের হাতিয়ার হিসেবে। এখন বাংলাদেশের প্রায় বেশিরভাগ প্রতিষ্ঠিত কোম্পানীর রয়েছে নিজস্ব এক বা একাধিক মিডিয়া। যা অনেক ক্ষেত্রেই তাদের ব্যবসায়িক দৃষ্টিভঙ্গির মাধ্যমে পরিচালিত হয়। তাদের ব্যবসার প্রচার-প্রচারণা ও নিজেদের ব্যবসা সেল্টার দেওয়ার জন্যই অনেক ক্ষেত্রে কাজ করে মিডিয়াগুলো। এমনকি ব্যবসায়িক প্রতিপকে আঘাত করার অপচেষ্টাও ল্য করা যায় অনেক ক্ষেত্রে ঐ সব মিডিয়া হাউসগুলোর দৃষ্টিভঙ্গির আলোকেই নিয়োগ দেওয়া হয় মফস্বলের সাংবাদিকদের। ফলে অনেক সময় ঐ প্রতিষ্ঠানের পরে লোক হিসেবে কাজ করার কারণে স্বাধীন পেশা সাংবাদিকতা তখন কার্যকর থাকে না। অনেকটা পরাধীন হিসেবে কাজ করতে হয় তাদের পক্ষে। তাদের চাহিদা মোতাবেক সংবাদ পরিবেশন করতে হয় মিডিয়াগুলোতে, তা না হলে হয়ত ঐ সংবাদ কখনই স্থান পাবে না মিডিয়ায়।

ফলে মিডিয়ার দৃষ্টিভঙ্গিই মফস্বল সাংবাদিকদের লেখাকে নিয়ন্ত্রন করে। ঘটনার সঠিক বিবরণ লেখা হলে যদি ঐ মিডিয়ার দৃষ্টিভঙ্গির বিরোধী হয় তাহলে তা পরিবর্তন করে তাদের দৃষ্টিভঙ্গি অনুযায়ী লেখতে হবে সাংবাদিকদের। ফলে সক্রিয়তা বিসর্জন দিতে হয় সাংবাদিকদের। মিডিয়ার মালিকরা শুধুমাত্র নিজেদের কাজে ব্যবহারের করেন অবহেলিত সাংবাদিক সমাজকে।

অনেক সময়ই একই সংবাদ বিভিন্ন মিডিয়া বিভিন্ন ভাবে উপস্থাপন করা হয়। তা সমস্ত কিছুই নির্ভর করে যারা প্রকাশনার সাথে জড়িত তাদের উপর, মফস্বলের সাংবাদিকদের উপরে নয়। হয়ত স্থানীয় একটা সংবাদ স্থানীয়দের কাছে অনেক গুরুত্বপূর্ণ মনে হলেও তা পত্রিকার কর্তৃপরে কাছে দৃষ্টিভঙ্গির কারণে কোন গুরুত্ব বহন করে না। ফলে হয়ত জনসাধারণ মনে করেন স্থানীয় সাংবাদিকদের অবহেলার কারণে সঠিকভাবে সংবাদটি পরিবেশিত হয়নি। কর্তৃপরে কারণে দায় বহন করতে হয় মফস্বলের সাংবাদিকদের।

মিডিয়া হাউসগুলোর এরকম স্বেচ্চারিতা, বেতন কাঠামো বৈষম্য ও মফস্বলের সাংবাদিকদের থেকে অনৈতিক দাবির কারণে অনেক সময় সাংবাদিকদের উপর নিয়ন্ত্রণ রাখতে পারেন না তারা। ফলে মফস্বলের সাংবাদিকরা বিভিন্ন দুর্নীতির সাথে জড়িয়ে পড়লেও তাদের তার প্রতি নজর দেয়া সম্ভব হয় না।

এছাড়া মফস্বল সাংবাদিক নিয়োগের ক্ষেত্রেও নেই কোন নিয়োগ কাঠামো। যার কারণে দীর্ঘদিন থেকে সাংবাদিকতার সাথে জড়িত থেকেও অনেক সিনিয়র সাংবাদিক ভালো মিডিয়া হাউসগুলোতে নিয়োগ না পেলেও বিভিন্ন ভাবে মিডিয়ার কর্তৃপকে ম্যানেজ করে সাংবাদিক পেশার সাথে জড়িত নন এমন ব্যক্তি যারা কিনা শুধুমাত্র সাংবাদিকতাকে নিজের স্বার্থে ব্যবহারের জন্য জড়িত করেন এমন ব্যক্তিরা অনুমতি পাচ্ছেন সাংবাদিকতার মতো মহান পেশায়।

ফলে দিন দিন অপসাংবাদিকদের ভীড় বৃদ্ধি পাচ্ছে মফস্বলের সাংবাদিকতায়। কুলষিত হচ্ছে সাংবাদিকতার মহান পেশা। এসব অপসাংবাদিক মনোভাব সম্পন্ন ব্যক্তিবর্গের পদচারণায়ই প্রকৃত সাংবাদিকদের পোহাতে হচ্ছে ভোগান্তি। এই সামান্য মাত্র সংখ্যক সাংবাদিকদের কারণে জনসাধারণ তখন সমস্ত সাংবাদিক সমাজের প্রতি আঙ্গুল তুলিয়ে বলেন এরা হলুদ সাংবাদিকতা করেন।

বেশিরভাগ মিডিয়া হাউসগুলোতেই নেই মফস্বল সাংবাদিকদের জন্য কোন নিরাপত্তা বিধান। স্থানীয় কোন প্রভাবশালী ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে মফস্বলের সাংবাদিকরা দুর্নীতি বা অনিয়মের প্রতিবেদন প্রকাশ করলে হুমকির সম্মুখীন হয় মফস্বলের সাংবাদিকরা। তাদের নিরাপত্তার খোঁজ নেন না মিডিয়া হাউসগুলোতে। অনেক সময় জীবন দিতে হয় সাংবাদিকদের। কিন্তু তাতে মিডিয়ার কর্তৃপরে কিছু যায় আসে না। যার কারণে বাধাগ্রস্ত হয় বড় ধরণের দুর্নীতি ও অনিয়মের প্রতিবেদন।

এছাড়া স্থানীয় পত্রিকাগুলোরও রয়েছে বাধ্যবাধকতা। স্বাধীনতাভাবে পেশাকে সমৃদ্ধ করতে পারেন না মফস্বলের সাংবাদিকরা। জেলা প্রশাসকের হাতে থাকে পত্রিকার অনুমোদনের বিষয়টি। তাই জেলা প্রশাসনকে খুশি রেখেই কাজ করতে হয় তাদের। এছাড়া রয়েছে মতাসীন রাজনৈতিক দল ও প্রভাবশালী রাজনৈতিক ব্যক্তিবর্গ ও অর্থশালীদের অনৈতিক চাপ। নিয়মিত পত্রিকা প্রকাশের ক্ষেত্রেও রয়েছে আর্থিক সমস্যা। কারণ পর্যাপ্ত বিজ্ঞাপনের বাজার এখনও উন্মুক্ত নয় মফস্বল শহরগুলোতে।

এত সীমাবদ্ধতার মধ্যেও দেশের বিশাল মফস্বল সাংবাদিকগোষ্ঠী প্রতিনিয়ত অবদান রেখে যাচ্ছেন জাতীয় স্বার্থে। এগিয়ে নিয়ে যাচ্ছেন দেশকে উন্নতির পথে। নিজের জীবনকে বিসর্জন দিয়ে, ভয়ভীতিকে তোয়াক্কা করে অবিরত ভাবে যুদ্ধ করে যাচ্ছেন অনিয়ম, দুর্নীতি, কুসংস্কারের বিরুদ্ধে ও জাতীয় অর্থনীতিসহ সুস্থ্য ধারা সংস্কৃতি বিকাশে। কোন কোন ক্ষেত্রে আর্থিক সঙ্গতির কারণে মফস্বলের দু’একজন সাংবাদিক অনৈতিক সুবিধা গ্রহণে বাধ্য হন। তবে তা অত্যন্ত নগণ্য। যা অন্যান্য পেশার ব্যক্তিদের সংখ্যার তুলনায় খুবই স্বল্প।

তবে মিডিয়া হাউসগুলোর দৃষ্টিভঙ্গির পরিবর্তন, মফস্বলের সাংবাদিকদের সরকার ঘোষিত ওয়েজবোর্ড বাস্তবায়ন, সরকার দলীয় ও রাজনৈতিক দলের লোকজনের প্রভাব ও স্থানীয় প্রশাসনের প্রভাব বন্ধ হলে হয়ত মফস্বলের সাংবাদিকতা হতে পারে একটি গৌরবময় সফল পেশা হিসেবে। তখন হয়ত জাতির দর্পণ সাংবাদিকরা তাদের আসল স্বাধীনতা ভোগ করে দেশকে এগিয়ে নিয়ে যেতে পারবেন উন্নতির শিখরে।

লেখক:
প্রকাশক, বাংলারশিক্ষাডটকম
ও মাদারীপুর প্রতিনিধি, চ্যানেল আই।